দেশব্যাপী ৭২ ঘন্টা হরতাল ঘোষণার পর গত শুক্রবার রাত্রে বিরোধী দলের পাঁচ শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে তাহাদের নিয়া যাওয়া হয় ডিবি কার্যালয়ে। তাহার ১২ ঘন্টারও বেশি সময় পর তাহাদের বিরুদ্ধে দুইটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এক পর্যায়ে তাহাদের আদালতে নিয়া যাওয়া হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী তাহাদেরকে কারাগারে পাঠানো হইয়াছে। তাহাদের বিরুদ্ধে রিমান্ড ও জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হইবে আগামী বৃহস্পতিবার। এইসব নেতার বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি পোড়ানো ও ভাঙ্চুরের মামলা দায়ের করা হইয়াছে। এই দেশে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার, হয়রানি এমনকি নির্যাতনের অভিযোগ খুবই মামুলি বিষয়। বলিতে গেলে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন হইতেই এই সংস্কৃতি চলিয়া আসিতেছে। ইহা লইয়া নূতন প্রজন্মের মধ্যে রহিয়াছে হাজারও প্রশ্ন।
এই দেশে বিরোধী দলের সিটিং এমপিকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতারেরও নজির রহিয়াছে। এমনকি কারাগারে পাঠানোর পর ডিভিশন দেওয়া হয় নাই, আছে এমন দৃষ্টান্তও। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বলিয়া কোন কথা নহে, সব সরকারের আমলেই কম-বেশি নীতিবিরুদ্ধ বা আইনের ফাঁক-ফোকরের ব্যবহার করিয়া রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা দেওয়ার উদাহরণ দেখিতে পাওয়া যায় ভূরি ভূরি। তাহাছাড়া আমাদের দেশে নিবর্তনমূলক বহু আইন ঔপনিবেশিক আমল হইতেই চলিয়া আসিতেছে। তাহার পরও কেহ তাহা সংশোধনের চেষ্টা করেন নাই। বরং সকলেই নিপীড়ন ও বিরোধী মতকে দমনমূলক আইনের প্রয়োগ অব্যাহত রাখিয়াছেন। এই পরিস্থিতি দেখিয়া যেই কেহ বাংলা একটি প্রবাদবাক্য আওড়াইতে পারেন। তাহা হইল, ইটটি মারিলে পাটকেলটিও খাইতে হয়। এই ব্যাপারে নিউটনের সেই বিখ্যাত তৃতীয় সূত্রটির কথাও বলিতে হয়। এই সূত্রের মর্মার্থ হইল, প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। সেই প্রতিক্রিয়ায় বর্তমানের ধরপাকড় চলিতেছে এমনটি মনে করা অনেকের পক্ষে অসংগত ও অসম্ভব নহে। ইহার নেতিবাচক প্রভাব দেশ ও সমাজের সর্বত্র পড়িতেছে এবং জনগণকে এইজন্য দিতে হইতেছে চরম মূল্যও।
গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিলে বলিতে হয়, এই পরিস্থিতি দেশ ও সমাজের জন্য মোটেও কল্যাণকর নহে। বরং ইহা অসুস্থতারই আলামত। ন্যায়-অন্যায় আবার উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন না রাখিয়াও বলা যায়, এই পরিবেশে পরবর্তী প্রজন্ম সুস্থভাবে বাড়িয়া উঠিতে পারে না। সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠন করিতে হইলে আমাদের অস্থিরতার মধ্যে কোথাও না কোথাও থামিতে হইবে। বাদাবাদি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, আমরা অর্থনৈতিকভাবে এখনও অসচ্ছল। জীবন মানের উন্নয়ন বলিতে প্রকৃতপক্ষে যাহা বোঝায় তাহা হইতে আমরা যোজন যোজন দূরে। রুটি -মাকান-কাপড়া তথা অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান আমাদের আজও সুনিশ্চিত নহে। তৃতীয় বিশ্বে মানুষের এইসব মৌলিক চাহিদার দাবিকে বরাবরই ভুল করিয়া বামপন্থি দাবি বলিয়া চালাইয়া দেওয়া হয়। তাহাদের জানা উচিত প্রকৃত ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বামপন্থি চিন্তার উন্মেষ ঘটিবার আগে হইতেই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সার মত মৌলিক অধিকারসমূহের নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে। উদার গণতান্ত্রিক ও মুক্তবাজার অর্থনীতির সমৃদ্ধ দেশগুলিতে মানুষের ভাত,কাপড় ও বাসস্থান নিয়া ভাবিতে হয় না। সেখানে সহজেই হওয়া যায় বাড়ি-গাড়ির মালিক। আজ মুক্ত অর্থনীতির এমন কোন দেশ নাই, যেইখানে মানুষের অতি প্রয়োজনীয় সেই মৌলিক অধিকারগুলি অপূর্ণ।
দেশে চলমান পরিস্থিতি সাইকোপ্যাথিক বা মানসিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। প্রসঙ্গত, বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আরেকটি সূত্র প্রণিধানযোগ্য, যাহার সার কথা হইল, একটি বস্তু বা ঘটনা ততদিন পর্যন্ত ঘটিতে থাকিবে যতদিন পর্যন্ত বাহ্যিক কোন কিছুর দ্বারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়া গেলে এমনিতেই সেই প্রতিবন্ধকতা আসিয়া উপস্থিত হয়।
