প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেত্রী গণতন্ত্রের ভাষা বোঝেন না। কারণ, এ দলটির জন্মই হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টে এক মিলিটারি ডিক্টেটরের পকেট থেকে। তারা ক্ষমতায় আসে দুর্নীতি ও মানুষের সম্পদ লুটে নিতে। তিনি বলেন, উনি (খালেদা) শুধু ধ্বংস আর কথায় কথায় হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও ও মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করতে জানেন। আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি গণতন্ত্রের ভাষা বোঝে না, হত্যা ও নির্যাতন করতে জানে। গতকাল শনিবার মৌলভীবাজারের বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতাকালে একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী দলের দেয়া একের পর এক হরতালের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত ৪ নভেম্বর থেকে সারাদেশে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমি বিএনপি নেত্রীকে পরীক্ষার সময় হরতাল না দেয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। কিন্তু উনি সে অনুরোধ রাখলেন না। সেই ৪ তারিখেই হরতাল দিলেন। উনিও তো একজন মা। এতগুলো বাচ্চা ছেলে-মেয়ের শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে উনার কী অর্জন হচ্ছে? হরতাল দিয়ে পেলেন কী? উনি কতগুলো মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। মনির হোসেনের মতো শিশুকেও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, মানুষ যখন পুড়ে মরে, তখন বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা সেখানে দাঁড়িয়ে হাসে। এটা কী ধরনের জঘন্য মনোবৃত্তি। এরা কী মানুষ?
জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মিছবাহউদ্দিন সিরাজ, সংসদের চীফ হুইপ ও মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুস শহীদ, সিলেটের সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান, সৈয়দ মহসিন আলী এমপি, ফজলুর রহমান এমপি, সাইফুজ্জামান শিখর, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমেদ প্রমুখ।
সকাল ১০টার পর থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে দলের নেতা-কর্মীরা জনসভাস্থল বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠে উপস্থিত হতে থাকে। দুপুর ২টার আগেই এই কলেজ ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা রক্ষায় দেশবাসীকে আবারো নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ মানেই শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। আর বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে দেশে যেন কিয়ামত নামে। দুর্নীতি, দুঃশাসন, জঙ্গিবাদ, মানুষ হত্যা এবং মানি লন্ডারিং হচ্ছে তাদের নীতি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাত্র সাড়ে ৪ বছরে বর্তমান সরকার দেশজুড়ে যে উন্নয়ন করেছে, অতীতের কোন সরকারই তা করতে পারেনি। আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে দেবো এবং প্রতি উপজেলায় একটি করে সরকারি স্কুল ও কলেজ করে দেয়া হবে। ২০২১ সালের মধ্যে উপহার দেবো একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নয়ন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
ভাষণের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী সমবেত জনতার কাছে জানতে চান, আগামী নির্বাচনে তারা নৌকায় ভোট দেবেন কিনা। তখন লাখো মানুষ দুইহাত তুলে এবং নৌকা নৌকা শ্লোগান দিয়ে পুরো এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশ্যে বলেন, দেশের নতুন প্রজন্ম শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠুক তা উনি চান না। ঘুষ, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার আর মানুষ হত্যাই হলো তাঁর নীতি। তাঁর (খালেদা জিয়া) পুত্রের ঘুষ-দুর্নীতির পাচারকৃত অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টে গিয়ে ধরা পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী নিজে তো এসএসসি পরীক্ষায় উর্দু আর গণিত ছাড়া আর সব বিষয়েই ফেল করেছিলেন। তাই উনি চান আমাদের সন্তানরা মুর্খ হয়ে থাকুক। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে টাকা নিয়ে উনি (খালেদা জিয়া) তাঁর দুই পুত্রকে কী শিক্ষা দিয়েছেন? কী ডিগ্রী নিয়েছে? দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অর্থ পাচার, গ্রেনেড হামলা ও হত্যার ওপর ছেলেদের ডিগ্রী দিয়েছেন। এসব কারণেই তিনি (খালেদা) লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষা বন্ধ করতে একের পর এক হরতাল দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার ক্ষমতায় এসে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এখন ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই পাঁচ বছরে ৫ কোটি দরিদ্র মানুষ মধ্যবিত্ত পর্যায়ে উঠে এসেছে। চা শ্রমিকদের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের পদক্ষেপের বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চা শ্রমিকদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করেছি। এবার প্রতিদিন চা শ্রমিকদের বেতন ৭০ টাকা করেছি। কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর রেললাইন নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। এই অঞ্চলের গ্যাস সংযোগ দীর্ঘায়িত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, কুলাউড়ার যে বিএনপির মেয়র হয়েছেন, তিনি মামলা করে গ্যাস লাইনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি বলবো, মামলা তুলে নেন। বড়লেখায় গ্যাস আসতে দেন।
প্রধানমন্ত্রী জনগণের ভোট নিয়ে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসলে বড়লেখা ডিগ্রী কলেজকে সরকারিকরণ, আতরের কারখানা ক্ষুদ্র শিল্প হিসাবে গড়ে তোলা এবং মৌলভীবাজারে চা নিলাম কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
আমির হোসেন আমু বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি আলোচনায় না এসে অরাজকতা সৃষ্টি করছেন। এ সময় তিনি ২০০৬ সালে আবদুল জলিল ও আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার মধ্যে ব্যর্থ সংলাপের কথা উল্লেখ করে বিরোধী দলীয় নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সেদিন যদি আপনি আলোচনা সফল করতে দিতেন, তাহলে আর মহাসচিব পর্যায়ে আজ আলোচনার দরকার ছিলো না। আপনি সে আলোচনা সফল হতে দেননি বলেই ওয়ান ইলেভেনের সৃষ্টি হয়েছিলো।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, বর্তমান সরকার দেশে জঙ্গিবাদ নির্মূল করেছে। কিন্তু আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে। সেটা আর হতে দেয়া যাবে না। দেশের মানুষ যদি আর জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে না চান তবে আগামী নির্বাচনে আবারও নৌকাকে বিজয়ী করে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নির্বাচনে সকলকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, যখন তারা (বিএনপি) বুঝেছে ভোটে পারবে না, তখন মানুষ পুড়িয়ে মারছে।
বেগম মতিয়া চৌধুরী বিরোধী দলীয় নেতার সমালোচনা করে বলেন, খালেদা জিয়ার একদিকে হেফাজত আর জামায়াত, অন্যদিকে সুদখোর-রক্তচোষা মোহাম্মদ ইউনূস। যে কিনা পুরুষে পুরুষে বিয়ের কথা বলেন। এই তিন অপশক্তির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় দেশবাসীকে একাট্টা হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
