হাসিন জাহান
ডাকনাম :হাসিন
জন্মতারিখ :১৭ এপ্রিল
মায়ের নাম :নূরজাহান বেগম
বাবার নাম :এম হাবিবুল্লাহ
প্রথম স্কুল :লালমাটিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা
প্রিয় পোশাক :স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায় এমন যেকোনো পোশাক
প্রিয় উক্তি :tomorrow will never come
সাফল্যের সংজ্ঞা :একাগ্র চেষ্টাতে মানুষ সফল হতে পারে।
পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। মানুষ, অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদ সবকিছু পানির উপর নির্ভরশীল। পান করা ছাড়াও সব ধরনের খাদ্য উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে পানি ব্যবহূত হয়। কিন্তু পৃথিবীর বেশিরভাগ জলভাগ হলেও পান করার উপযোগী পানি অতি সামান্য। তাই পান করার উপযোগী পানির উত্সগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করেন হাসিন জাহান। তার বেড়ে উঠা ঢাকাকেন্দ্রিক। জীবনের একটা বড় অংশ ঢাকার মোহাম্মদপুরে কাটিয়েছেন। প্রথম হাতেখড়ি লালমাটিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। তারপর পড়েছেন খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল বটমলিহোম গার্লস হাইস্কুল। কলেজজীবন কাটে হলিক্রস কলেজে। তারপর বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন বুয়েট থেকে। পাসের পর পরই অর্থাত্ ১৯৯৩ সালে লোকাল গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে একজন অ্যাসিস্টেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। এখান থেকে শিক্ষাকালীন ছুটি নিয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যে। সেখানে মাস্টার্স করেন ওয়াটার অ্যান্ড অ্যানভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে Loughborough University of Technology থেকে। এরপর দেশে ফিরে চাকরিতে যোগদানের পর ক্রমান্বয়ে পদোন্নতিতে একসময় এনভায়রনমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর ঠিক বছর চার পরেই যোগদান করেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রোগ্রাম, ডব্লিউএসপি-তে। এখানেই একটি প্রজেক্ট ছিল আইটি ইন বুয়েট। এটি বুয়েটের মধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠান যা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেক্টর প্রফেশনালদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। ডব্লিউএসপি’র তত্ত্বাবধানে হাসিন জাহানই প্রথম এই সেন্টারটিকে গড়ে তোলার জন্য কাজ করেন। সেসময় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে কখনও ‘লো কস্ট টেকনোলজি’ পড়ানো হতো না। তখন আইটি ইন সেন্টার ও তার একটি উল্লেখ্যযোগ্য কাজ ছিল তত্কালীন কারিকুলাম রিওরিয়েনটেশনে ‘লো কস্ট ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন’ সংযুক্ত করা। ফলে এখন যারা এই বিষয়ে পড়াশোনা করছেন তারা এই ‘লো কস্ট টেকনোলজি’ সম্পর্কে অবহিত হতে পারছেন। ডব্লিউএসপি-তে চার বছর কাজ করার পর হাসিন জাহান চলে আসেন ডানিডা ফান্ডেড প্রজেক্টে। সেসময়কার সবচেয়ে বড় এই ওয়াটার সাপ্লাই এবং স্যানিটেশন প্রজেক্টটি মোট আটটি জেলায় তাদের কার্যক্রম চালায়। ঢাকা অফিসে বসে তিনি এই প্রজেক্টটিতে কাজ করেন। এই কাজ শেষে ২০০৬ সালে তিনি যোগদান করেন ওয়াটারএইড বাংলাদেশে। বর্তমানে ওয়াটারএইড প্রায় ২৪টি জেলা এবং তিনটি সিটি কর্পোরেশনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সেখানে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মানুষগুলোর কাছে নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়াই এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে যে এলাকায় টিউবওয়েল বসানো যায় সেখানে গরিব মানুষের জন্য টিউবওয়েলের ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা শহরসহ যেসব জায়গায় মাটির নিচ থেকে টিউবওয়েলের মাধ্যমে পানি উত্তোলন সম্ভব নয়, সেখানে ওয়াসার পানির সুষুম সরবরাহ নিশ্চিত করে থাকে ওয়াটারএইড। যেমন যে বস্তিগুলো ওয়াসার পানির লাইনগুলো দূরে অবস্থিত, যেখানে পানি পৌঁছানো সম্ভব হয় না, সেখানে ওয়াটারএইড ট্যাব লাইনের মাধ্যমে পানি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে থাকে। আর এ কাজে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ওয়াসা তাদের সহযোগিতা করে। চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় যেখানে টিউবওয়েল কার্যকর নয়, সেখানেও গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেমে পাহাড়ি ঝরনার পানিটাকে ধরে ফিল্টার করে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে ওয়াটারএইড। এই রকম বিভিন্ন ধরনের টেকনোলজির মাধ্যমে তারা বিশুদ্ধ পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আর ওয়াটারএইডের এ সমস্ত কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাসিন জাহান।
তিনি জানালেন তার জীবনে দুটি মানুষ খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রথমজন বাবা, তিনি রেডিও বাংলাদেশের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বাবার অনুপ্রেরণায় জীবনের শুরুর দিনগুলোতে তিনি কাটিয়েছেন খুবই নিয়মতান্ত্রিকভাবে। বাবা শিখিয়েছিলেন, আজকের কাজ আজকেই কর, আগামী কাল করব বলে ফেলে রেখো না। এটিই তার জীবনের অন্যতম শিক্ষা হয়ে তার কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়েছে। আর জীবনের দ্বিতীয় অংশে একজন হাসিন জাহান হয়ে ওঠার পেছনে অনেক বড় অবদান রেখেছেন তার শাশুড়ি জেবুন্নেসা বেগম। একজন পরামর্শক এবং বন্ধু হিসেবে শাশুড়ি বরাবরই তাকে সাহায্য করেছেন। পারিবারিক সুযোগ-সুবিধা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পরামর্শ এবং জীবনের নানা দিকগুলোতে তিনি পেয়েছেন জেবুন্নেসা বেগমের অনেক সহায়তা। বর্তমানে স্বামী গোলাম রব্বানী, বড় ছেলে নায়েফ রেজা এবং ছোট ছেলে মাহদিকে নিয়েই তার পারিবারিক আবহ। হাসিন জাহান একটি বেসরকারি টেলিভিশনে পানি এবং স্যানিটেশন পদ্ধতি নিয়ে ‘জলকথা’ নামে একটি টেলিভিশন প্রোগ্রাম উপস্থাপনা করেছেন।
এই প্রজন্ম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে হাসিন জাহান বলেন, ‘এই প্রজন্ম যথেষ্ট স্মার্ট এবং তারা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ করছে। মানুষ যুগের সাথে সাথে তার চিন্তাভাবনাকেও পরিবর্তন করছে। এখন যারা কাজ করছে তারা অনেক বেশি টেকনোলজিক্যাল সাপোর্ট গ্রহণ করছে। এটা খুবই ভালো। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, সৃষ্টিশীলতা নিজ থেকে তৈরি করতে হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি তাকে সাপোর্ট দেবে। সেজন্য টেকনোলজির সুবিধা বেশি নিতে গিয়ে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করা যাবে না। তবে আমি যা দেখেছি, নতুনরা খুবই বুদ্ধিমান। তারা ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদিকে ব্যবহার করে অনেক অ্যাডভান্স কাজ করে। তবে এর পাশাপাশি দেখা যায় অনেকের জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ কম। এজন্য বেশি বেশি বই পড়তে হবে। ব্যবহারিক জ্ঞান আহরণ করে তা কাজে লাগাতে হবে। জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই এবং অধিক অধ্যয়ন ছাড়া সফলতার কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। জ্ঞান অর্জন এবং টেকনোলজি গ্রহণ করে তাদের প্রকৃত সমন্বয় ঘটাতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। তবে একটা কষ্ট আছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকৃত মেধাবী তরুণ প্রজন্মের অনুপস্থিতি রয়েছে। একই সাথে ভালোলাগার ব্যাপার হচ্ছে, অনেকেই মনে করেন দেশ ও জাতি নিয়ে এই প্রজন্মের তেমন একটা ভাবনা নেই, কিন্তু বর্তমানে নতুন প্রজন্মের কার্যক্রমে স্পষ্ট যে, দেশ ও জাতি নিয়ে তাদের ভাবনা অনেক আধুনিক এবং অর্থবহ।’
