হরতালে আবারো দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে ঝলসে গেল সাতজনের শরীর। ওই মানুষগুলোর সঙ্গে পুড়ল সাত সাতটি পরিবার। ওই সাতজন কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিল না। রাজনীতি কি? কেন দিনের পর দিন হরতাল ডাকা হচ্ছে তারা এর কিছুই জানে না। জীবিকার তাগিদে, পেটের তাগিদে অন্যান্য দিনের মতোই তারা ঘর থেকে বেরিয়েছিল যার যার কাজে। কিন্তু কয়েক বোতল পেট্রোল, কেরোসিন ও দিয়াশলাইয়ের কয়েকটি কাঠিই এই সাতজন ও তাদের পরিবারে নিয়ে এসেছে অমানিশার অন্ধকার।
রবিবার ভোর ৫টা। জনসেবা পরিবহনের একটি বাসের হেল্পার মো. রনি (১৩)। মিরপুর বেরিবাঁধের কাছে রাখা বাসে ঘুমিয়ে আছে রনি। হঠাত্ কয়েক জন তরুণ বোতলে করে আনা পেট্রোল ঢেলে দিল বাসে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাসে। আগুনের আঁচে ঘুম ভেঙ্গে যায় রনির। দ্রুত বাসের জানালার গ্লাস ভেঙ্গে নিচে লাফিয়ে পড়ে সে। কিন্তু ততক্ষণে তার শরীরের বেশ কিছু অংশ ঝলসে যায়। পরে স্থানীয়রা এসে বাসের আগুন নেভায়। গুরুতর আহত রনিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করে। বর্তমানে রনি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। বার্ন ইউনিটের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ডা. শামন্ত লাল সেন জানান, রনির শরীরের প্রায় ১০ ভাগই পুড়ে গেছে।
রনির গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাটিপাড়ায়। বাবার নাম মো. আলমাস। সাভারের পশ্চিম ব্যাংক কলোনিতে রনির পুরো পরিবার থাকে। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রনি দ্বিতীয়। অভাব অনটনের সংসারে ১৩ বছর বয়সেই রনির ওপর পড়েছে পরিবারের ভরণপোষণের গুরু দায়িত্ব।
গতকাল রাত ৯টায় রাজধানীর পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে একটি যাত্রবাহী লেগুনায় পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। লেগুনাটি সদরঘাট থেকে মিল ব্যারাকের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় লেগুনায় ছিল সাত থেকে আট জন যাত্রী। মুহুর্তে আগুন ছড়িয়ে পরে লেগুনায়। কয়েকজন লাফিয়ে নামতে পারলেও তিন জন লেগুনা থেকে বের হতে পারেনি। আগুন ছড়িয়ে পড়ে এই তিন জনের শরীরে। পুড়ে যায় তাদের প্রায় সারা শরীর। অগ্নিদগ্ধরা হলেন, তাঁতি বাজারের স্বর্ণকার মন্টু পাল (৩০), পুরান ঢাকার একটি দর্জি দোকানের কর্মচারী কামাল হোসেন (৩৫) ও মিল শ্রমিক শ্রী মুক্তার (২৬)। পরে তাদেরকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে মন্টু পালের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। তার শরীরের প্রায় ৯৫ ভাগই পুড়ে গেছে। রাতে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ছুটে আসেন অগ্নিদগ্ধদের স্বজনেরা।
শনিবার রাত ৯টা। ধানমন্ডি ১৩ নম্বর রোডের মাথায় একটি পিকআপ ভ্যানে হঠাত্ মোটরসাইকেলে আসা তিন তরুণ পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভ্যানে। আগুনে ঝলসে যায় চালক সাবু আকতারের (৩৫) শরীর। পুড়ে যায় তার গাড়িটিও। সাবু আকতারের একার উপার্জনে চলে তার পরিবার। এখন তার পরিবারটি না খেয়ে মরার দশা হয়েছে।
সাবু আকতারের বাড়ি খুলনার খালিশপুর উপজেলায়। থাকেন শ্যামলী দ্বিতীয় হাউজিং প্রকল্পের ৪ নম্বর রোডে সপরিবারে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন সাবু আকতারকে গতকাল দেখা গেছে বেড়ে শুয়ে গোঙ্গাচ্ছেন। বললেন, ভাইরে পরিবার কেমনে চলবে এটাই পোড়াচ্ছে আমাকে।
এলিফ্যান্ট রোডে অবস্থিত একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পিয়ন মিঠু (২২)। শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় শাহবাগ মোড়ে বাসে উঠার সময় পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণে তার শরীর ঝলসে যায়। কেরানীগঞ্জ ইকুরিয়া হাসনাবাদ এলাকায় থাকেন তিনি। বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসে উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি। মিঠুও পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। বতর্মানে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন।
ময়মনসিংহ শহরের চালাকপাড়া এলাকায় গত শনিবার রাত ৯টায় কয়েকজন তরুণ পেট্রোল ঢেলে একটি মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। চোখের পলকে বাসটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। চালক হারুন অর রশিদ (৩২) মাইক্রোবাস থেকে নামার আগে তার সারা শরীর ঝলসে যায়। তার অবস্থা খুবই গুরুতর। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ডা. শামন্ত লাল সেন বলেন, এই সাতজনের অবস্থাই আশংকাজনক।
