চট্টগ্রামে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও কাজের পরিবেশ অনেক উন্নত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি, চাকরি ছেড়ে দিলে কল্যাণ ফান্ডের টাকা ফেরত না দেয়া ও চিকিত্সা ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। গার্মেন্টসে তদারকি কাজে নিয়োজিত সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের চলাফেরা, কাজের পরিবেশ ও ছুটি নিয়ে প্রতিবন্ধকতাগুলো অনেকাংশে লাঘব হয়েছে। ৪৪০টি গার্মেন্টস কারখানাকে বিরাজমান সমস্যা ও কাজের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে নোটিস দিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি নামে একটি সংস্থা। সংস্থার চট্টগ্রাম জেলা আহ্বায়ক হাসান মারুফ রুমি ইত্তেফাককে বলেন, ‘কাগজে-কলমে গার্মেন্টসের পরিবেশ উন্নত বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ইপিজেডের বাইরের গার্মেন্টসগুলোতে চিকিত্সার ব্যবস্থা নেই। প্রাপ্ত ছুটি দিতে চায় না। কোন শ্রমিক ৬/৭ মাস পর চাকরি ছেড়ে দিতে চাইলে মাসিক বেতন থেকে টাকা কেটে নেয়া হয়। কল্যাণ ফান্ডের টাকাও ফেরত পায় না শ্রমিকরা। কারখানায় কাজের পরিবেশের কোন উন্নতি হয়নি।’
সূত্র জানায়, গার্মেন্টসগুলোতে দুর্ঘটনা নিয়ে আতংক বহুলাংশে কমে গেছে। কোন ধরনের দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সে জন্য গার্মেন্টস মালিক শ্রমিক সকলেই সতর্কতার সাথে কাজ করছেন। দাবি দাওয়া নিয়ে যাতে কোন অসন্তোষ সৃষ্টি না হয় তার প্রতি লক্ষ্য রেখে কারখানা পরিচালনা করছেন মালিক পক্ষ।
চট্টগ্রামে সরকারি প্রতিষ্ঠান কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তর জানায়, চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত প্রায় ৮১০টি গার্মেন্টস রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে। গার্মেন্টসগুলোকে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করেন তারা। গার্মেন্টস ৪টি বিষয় মেনে পরিচালিত হচ্ছে কিনা দেখা হয়। এগুলো হচ্ছে চাকরির নিয়োগপত্র ও আইডি কার্ড, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, চিকিত্সা সেবা ও কল্যাণ ফান্ড। এসব বিষয় নিশ্চিত থাকলে ‘এ’ ক্যাটাগরির গার্মেন্টস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।
কারখানা পরিদর্শন দপ্তরের একজন কারখানা পরিদর্শক (প্রকৌশল) জানান, রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো অনেক পরিবর্তন এসেছে। আইন কঠোর প্রয়োগের কারণে অনেক ক্ষেত্রে গার্মেন্টস মালিকরা শর্ত পূরণে বাধ্য হয়েছে। যারা করেনি এই রকম ৪৪০টি কারখানা কর্তৃপক্ষকে নোটিস দেয়া হয়েছে। ঐ কর্মকর্তা জানান, নগরীর অধিকাংশ গার্মেন্টস অপরিকল্পিতভাবে আবাসিক বাসা ভাড়া নিয়ে করা হয়েছে। সিঁড়িগুলো সরু, কারখানার ভেতর মেশিন বসানোর কারণে শ্রমিকরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে না। কর্তৃপক্ষ তাদের পণ্যের নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কারখানার বিভিন্ন স্থানে দেওয়াল নির্মাণ, দরজা বন্ধ রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। প্রধান ফটক সার্বক্ষণিক তালাবদ্ধ থাকে। ফলে দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকরা আটকা পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে গার্মেন্টস চাকরিরত মহিলা শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৬ সপ্তাহ ছুটিকালীন বেতন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
বিজিএমইএ সূত্র জানায়, কারখানাগুলোর অবকাঠামোগত বিভিন্ন দিক উন্নয়নে মালিক পক্ষ নিজ দায়িত্বে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কারখানার অবকাঠামো ঠিক রয়েছে কিনা কারখানা কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে প্রকৌশলী নিয়োগের মাধ্যমে পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট নিয়ে রাখছেন। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে কারখানা স্থানান্তর সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে চট্টগ্রামের কারখানাগুলোর অবকাঠামো অনেক উন্নত। গার্মেন্টস মালিকরা নিজ দায়িত্বে কারখানার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
এদিকে গার্মেন্টসগুলোর অবকাঠামো তদন্ত করতে সিডিএ’র গঠিত কমিটি কাজ বন্ধ রেখেছে। তারা প্রথম দিকে প্রায় ১০০টি গার্মেন্টস পরিদর্শন করে ভবনের অবকাঠামো পরীক্ষা করে দেখেছে। এ ব্যাপারে সিডিএ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল আমিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন গার্মেন্টসের গুণগত মান পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়ায় আমরা তদন্ত করছি না। তবে আমরা যে ১০০টি গার্মেন্ট ভবন পরীক্ষা করে দেখেছি তাতে বড় ধরনের কোন সমস্যা ধরা পড়েনি।’
