গুজরাটি ‘হরতাল’ শব্দটি বাংলা শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হওয়াটাই বোধহয় ভুল ছিল। কারণ হরতালের বেতালে বাঙালি আজ তালহীন, দিশেহারা হয়ে পড়ছে। যে কোনো রাজনৈতিক দলের সরকারের কাছ থেকে দাবি দাওয়া আদায়ের একটি মোক্ষম হাতিয়ার হলো হরতাল। বলা হয়ে থাকে, এটি জনগণের একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো হরতালের ইতিহাসও বেশ ঘটনাবহুল। কিন্তু স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরে হরতাল আর আগের সংস্কৃতিতে আবদ্ধ নেই। দেশ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলেছে, তরুণরা জেগে উঠেছে, বাংলার মানুষ আজ সচেতন হয়েছে। তাই বাংলাদেশের মানুষ হরতালের নামে আর জ্বালাও-পোড়াও, বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ দেখতে চায় না।
বাংলাদেশের শীর্ষ দু’টি রাজনৈতিক দলের হরতাল প্রসঙ্গে অবস্থান অভিন্ন। অন্য সব ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ভিন্ন। সরকারে থাকলে ঘোষণা দেওয়া হয়, আমরা বিরোধীদলে গেলেও কোনো হরতাল দেবো না। এমনকি আইন করে হরতাল বন্ধের কথাও তাদের মুখ দিয়ে শোনা যায়। অথচ কী এক অদৃশ্য কারণে হরতাল বন্ধে আমরা কাউকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখি না। এমনকি সরকারি দল বিরোধীদলে গেলে হরতাল না দেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে দিনের পর দিন হরতাল কর্মসূচি পালন করতে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের নাম করে হরতাল ডেকে জনগণেরই জানমালের ক্ষতি করে। যাত্রীবাহী গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়। পিকেটারদের ছোড়া ককটেল-পেট্রোল বোমায় পঙ্গু হয় অসংখ্য নিষ্পাপ পথশিশু। তারা পেশাদার সাংবাদিককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। এমনকি সংবাদপত্র বহনকারী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত গাড়িগুলোতেও তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরতালের আগের দিনই সন্ধ্যা-রাতে গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে, ককটেল ফাটিয়ে হরতালের উত্তাপ জানান দিতে দেখা যায়। পরীক্ষাগুলো হরতালের কারণে অনুষ্ঠিত হয় না। রাজনীতিবিদেরা ঘোষণা দেন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করছে। অথচ জনগণ এখন ভয়ে-আতঙ্কে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয় না। স্কুল থাকে বন্ধ। শ্রমিকরা কাজ পায় না। চাকরিজীবীরা নিরাপদে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে পারে না। রাস্তায় গাড়ি চলে না। অর্থনীতির চাকা থমকে দাঁড়ায়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। এই কি জনগণের হরতাল? বাংলার জনগণ হরতাল পালন করে না, তারা মানুষ পুড়িয়ে মারে না। কে না জানে যে রাজনৈতিক দলের ভাড়া করা পাণ্ডা, সন্ত্রাসী আর পিকেটাররাই এসব করে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় জানা যায়, আমাদের দেশের ৯৫% হরতাল ডাকা হয় রাজনৈতিক কারণে। আর এই রাজনৈতিক হরতালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। এক দিনের হরতালে অন্তত ক্ষতি হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে পোশাকশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং পরিবহন। এর চেয়েও বড় কথা হলো হরতালে ঝরে যায় অসংখ্য তাজা প্রাণ। পত্রিকান্তরে জানা যায়, হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় বিগত ২২ বছরে প্রাণহানি ঘটেছে ২৫১৯ জন মানুষের। ফলে ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের এই হরতাল বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলও একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে। বর্তমানে বিরোধী দলও একই পন্থা অনুসরণ করে চলছে। ষাট ঘণ্টার ম্যারাথন হরতাল শেষ হতে না হতেই আবার চুরাশি ঘণ্টার হরতাল শুরু হয়েছে। এরূপ পর্যায়ক্রমিকভাবে একবার সরকারি দল আর একবার বিরোধী দল তাদের দলীয় স্বার্থকেন্দ্রিক দাবি-দাওয়া পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরতাল কর্মসূচি চালাতেই থাকবে। আর তাদের এই নিষ্ঠুর হরতাল হরতাল খেলায় জনগণ পিষ্ট হবে বার বার। কিন্তু বাংলার জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা রাজনৈতিক দলের দাবা খেলার গুটি হিসেবে আর ব্যবহার হতে চায় না। তাই হরতাল বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি, জনগণের দাবি। হরতালের বিকল্প কর্মসূচি নিয়ে ভাবতে হবে।
ঢাকা
