প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র বিতর্ক এখন জোরেসোরে চলছে। মন্ত্রীদের রকমফের কথায় এই বিতর্কে যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা। বলা যায় উস্কে দেয়া হচ্ছে এই বিতর্ক। সোমবার এই পদত্যাগপত্র জমা দেয়া হয়।
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী কেউই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেননি। এমনকি তাদের আলাদা আলাদা লেখা পত্র ( প্রধানমন্ত্রীর হাতে দেয়া হয়েছে) তা রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যেও লেখা নয়। তারিখবিহীন পত্র রাষ্ট্রপতি বরাবর লেখা নয়-এটি প্রধানমন্ত্রী বরাবর লেখা। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সবাই লিখেছেন অভিন্ন বাক্য। তারা লিখেছেন,‘ আমি অমুক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত অমুক নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের স্বার্থে পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করছি’।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো মন্ত্রী রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য পদত্যাগপত্র দিলে তা পদত্যাগপত্র হবে। যে পদত্যাগপত্র দেয়া হয়েছে তা রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য নয়। কাজেই ৫৮(১) ক বিধানটি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের এক দফার ‘ক’ উপদফায় বলা আছে, ‘কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদ শূন্য হবে, যদি তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন।’
সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের ২ দফায় বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ওই অনুরোধ পালনে ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রী তখন রাষ্ট্রপতিকে উক্ত মন্ত্রীর নিয়োগ বাতিলের পরামর্শ দিতে পারবেন।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, সংবিধান মেনেই পদত্যাগ করা হয়েছে। ব্যাখ্যা চাইলে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, পদত্যাগ করিনি-পত্র দিয়েছি। পত্রে তারিখ উল্লেখ নেই।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঞা বলছেন, প্রতিটি পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি বরাবর লেখা থাকতে হবে। অভিপ্রায় ব্যক্ত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখন প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তিনি কারো অভিপ্রায় গ্রহণ করে তা কার্যকর করতে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করতে পারেন আবার কোনটি গ্রহণ নাও করতে পারেন।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। অনেকেই বলছেন মন্ত্রিসভার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেকে মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের বৈধতাও নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এরকম তর্ক-বিতর্ক যখন তুঙ্গে-তখন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ঘটনাটির খোলস উন্মোচন করলেন কিছুটা।
আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা কেউ পদত্যাগপত্র দেননি। তারা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য পদত্যাগপত্র দিলেই তা কার্যকর হয়, এক্ষেত্রে তা হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে কোনো পদত্যাগপত্র দেয়া হয়নি, এটি পদত্যাগপত্রই না, এটি একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। অবশ্য এটা কিসের আনুষ্ঠানিকতা জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করেননি আইনমন্ত্রী।
আইনমন্ত্রী বলেন, পত্র দিলেই তা পদত্যাগ হবে না, একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে যে এটি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মন্ত্রীরা কেউ পদত্যাগ করেননি, তারা অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন মাত্র। যে পদত্যাগপত্র দেয়া হয়েছে, তা সংবিধান অনুযায়ীও হয়নি। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার আগ পর্যন্ত কোনো পদত্যাগপত্রই কার্যকর হয় না। কাজেই মন্ত্রিপরিষদে যারা আছেন তারা মন্ত্রী হিসেবেই আছেন। তাদের পদ শূন্য হয়নি, মন্ত্রীর সুযোগ সুবিধা নেয়া এবং দায়িত্ব পালনেও কোনো বাধা নেই।
যারা সর্বদলীয় সরকারে থাকবেন না, ‘তাদের আবার নতুন করে পদত্যাগপত্র দিতে হবে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এটি কার্যকর করতে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য দিতে হবে, আবার পদত্যাগপত্র দিতে হবে না’, ‘পদত্যাগের জন্য মুখে বললেই হবে’।
তাহলে সোমবার মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে যে পত্র দিয়েছেন, তাকে কি বলা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে শফিক আহমেদ বলেন, “আপনারা যা খুশি বলতে পারেন।” তাহলে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার নামে মন্ত্রীরা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন কি না-এমন প্রশ্নে শফিক আহমেদ বলেন, “না, মোটেই না। প্রতারণার কি আছে?”
এর আগে অবশ্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ ও রেলপথমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পৃথক ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করেন। সোহেল তাজ রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়ার উদ্দেশ্যেই পদত্যাগপত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু তা-ও গ্রহণ করা হয়নি।
