রাজনৈতিক যে অচলাবস্থা চলিতেছে তাহা ক্রমেই কি আরও বাড়িবে- এমন উদ্বেগজনক প্রশ্নই এখন সর্বত্র ঘুরপাক খাইতেছে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মাঝে ইহা আরও বেশি আলোচ্য বিষয়। কেননা, তাহাদের বিনিয়োগ সুরক্ষা, ব্যবসা চালু রাখিতে সহায়ক প্রচেষ্টা সবটাই আজ উপেক্ষিত। অর্থনীতিকে অগ্রসর করিবার মাধ্যমে দেশকে অগ্রসর করিবার যে প্রচলিত ধারণা, তাহা এই মুহূর্তে যেন লোপ পাইয়াছে। ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণেই এমনটি হইয়াছে। পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় গিয়া ঠেকিয়াছে যে, ক্ষমতার পালাবদল উপলক্ষ হইলেও ইহার পিছনে অন্য কোন ষড়যন্ত্র আছে কি না, তাহাও ভাবিয়া দেখিবার বিষয়।
স্বাধীনতার চার দশক পার হইয়াছে। দেশ অগ্রসর হইতেছে। আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনও লক্ষণীয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশকে আগাইয়া নিতে কার্যকর ভূমিকা রাখিতেছে এইদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা সমাজ। ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করিতে হইলে সহায়ক পরিস্থিতি অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তুু বিদ্যমান রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলে দেশে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে। দেখা দিয়াছে সবধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্থবিরতা। কলকারখানায় উত্পাদন হইতেছে না। কাঁচামাল পড়িয়া আছে বন্দরে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীরও সরবরাহ সম্ভব হইতেছে না। অথচ একজন উদ্যোক্তাকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করিতে হইবে। শ্রমিকদের বেতনভাতাদিও সময়মত পরিশোধ করিতে হইবে। কিন্তুু কিভাবে তাহা সম্ভব হইবে? এই রকম পরিস্থিতিতে পড়িলে ভাল উদ্যোক্তাও যে ঋণখেলাপি হইয়া যাইবে, এমনটি হলফ করিয়াই বলা যায়। শুধু যে খেলাপি হইবে তাহাও নহে, বরং প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যে পিছাইয়া পড়িবে। সময়মত পণ্য সরবরাহ করিতে না পারিলে আন্তর্জাতিক বাজার দখল করিয়া নিবে অন্য দেশের ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যেই বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি আদেশ বাতিল করিয়াছেন, এমন খবরও প্রকাশিত হইয়াছে। তাহাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমিবে। কমিয়া যাইবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ না থাকিলে আমদানি ব্যয় মিটানো সম্ভব হইবে না। আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরনের সংকটে পড়িবে দেশের অর্থনীতি। দেশেও খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত হইবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি। এমন এক পরিস্থিতি মোটেও কাম্য হইতে পারে না। যেখানে কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ মিথ্যা প্রমাণ করিয়াছে বাংলাদেশ। এখন ঐধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করিয়া কি তবে সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দিকেই আমরা ধাবিত হইবো? নাকি আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে অভ্যন্তরীণ কিংবা বহির্বাণিজ্যে যাহারা লাভবান হইবে তাহাদের স্বার্থেই ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি অবিরত চলিতেছে?
রাজনীতিবিদরা রাজনীতির স্বার্থে কর্মসূচি দিবেন- এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তুু সেই কর্মসূচি দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়া হইতে পারে না। আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হইতে চাহি। দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করিয়া ক্ষমতার পালাবদল কখনোই জাতীয় স্বার্থকে সংরক্ষণ করিতে পারিবে না। তাই এই ধরনের আত্মঘাতী কর্মসূচি হইতে সরিয়া আসিয়া রাজনীতিবিদরা দেশের স্বার্থকে বড় করিয়া দেখিবেন এবং উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী তথা আপামর জনগণকে আশার বন্ধনে স্বপ্নময় আগামীর ট্রেনযাত্রী করিবেন- এমনটাই আজ জরুরি।
