আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একের পর এক হরতাল আর হানাহানির ঘটনা অর্থনীতিকে গতিহীন করে দিচ্ছে। নানাবিধ সংকটের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট যোগ হয়ে শিল্প কারখানায় অচলাবস্থা তৈরি করেছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। নতুন নিয়োগতো দূরের কথা, কর্মী ছাঁটাইয়ের পথেই হাঁটছে কারখানা মালিকরা। এমনকি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়ার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেছে উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ। এ অবস্থায় চাকরির বাজারের কি দশা হবে—এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, দেশে প্রতিবছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে ২০ লাখ নতুন মুখ। তাদের কর্মসংস্থান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা হবে কিভাবে? এর উত্তর যদি শিগগিরই না পাওয়া যায় তাহলে বেকারত্বের বোঝা টানতে হবে সমাজকেই।
এদিকে বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বন্ধ হতে বসেছে বেশিরভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান। ন্যূনতম মজুরি নিয়ে মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্বে ৪০ লাখ শ্রমিকের তৈরি পোশাক শিল্পেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। অচলাবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, এ মুহূর্তে নতুন নিয়োগের কথা ভাবছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে কর্মসংস্থানের হারও কমে আসছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের বেকারত্বের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত থাকলেও এ হার যে কমছে না, তা পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেবেই স্পস্ট। সাধারণত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় পোশাক শিল্প, রিয়েল এস্টেট এবং অবকাঠামো খাতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেকারত্বের হার প্রায় সাড়ে চার শতাংশ থাকলেও এখন যে পরিস্থিতি চলছে তা অব্যাহত থাকলে এ হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক সংঘাত চলতে থাকলে দেশের কর্মসংস্থান আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। হরতালের আওতামুক্ত হলেও বিজিএমইএ’র হিসেবে শুধু গার্মেন্টস শিল্পে একদিনে হরতালে উত্পাদন ব্যাহত হয় প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ৩৫টি কারখানায় অর্ডার বাতিল হয়েছে ২৭ লাখ ডলারের সমপরিমাণ। এ লোকসান কমিয়ে আনতে ব্যয় হ্রাসের দিকে মনোযোগী হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে নতুন নিয়োগের বিষয়ে চিন্তাও করতে পারছেন না তারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে ২০০২-০৩ অর্থ বছর থেকে ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশে স্থির ছিলো। তবে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হলেও ২০১০ সাল থেকে এ হার বেড়ে সাড়ে চার শতাংশ হয়েছে। গত দু’বছরে এই হার আরো বেড়েছে বলে দাবি করেন অর্থনীতিবিদরা।
শুধু তাই নয়, দেশের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। শিক্ষার হার বাড়লেও বাড়ছে না কর্মসংস্থানের সুযোগ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারের সংখ্যাও বেড়ে প্রায় ২১ শতাংশে পৌঁছে গেছে। অথচ এরাই হচ্ছে শক্তিশালী কর্মক্ষম ব্যক্তি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী এজেন্ডা ছিল ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান। কিন্তুু বেকারত্বের তুলনায় কর্মসংস্থান হয়েছে কমই। উপরন্তু সৃষ্ট অচলাবস্থা চাকরির বাজারকে আরো বেশি কঠিন করে তুলেছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বিদ্যমান অচলাবস্থা বিনিয়োগকারীদের হতাশ করে দিচ্ছে। নতুন বিনিয়োগতো দূরের কথা, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরাও তাদের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের কথা ভাবতে পারছেন না। এতে যে শুধু কর্মসংস্থানের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, দেশে উত্পাদন কমছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি।
