‘বিয়ের পর একদিনও তোমাকে সময় দিতে পারিনি। তোমার সঙ্গে একত্রে খাবার খেতে পারিনি। সঞ্জু আমি বাসায় আসছি, রাতে তোমার সঙ্গে খাবার খাব।’ গত ১০ নভেম্বর রাতে রাজধানীর তাঁতীবাজারে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘন্টাখানেক আগে ফোন করে স্ত্রী সঞ্জুকে এই কথা বলেছিলেন মন্টু পাল।
স্বামীর প্রিয় সব খাবার তৈরি করে বসে ছিলেন অন্ত:সত্ত্বা সঞ্জু। অপেক্ষার প্রহর কিছুতেই শেষ হচ্ছিল না তার। এ সময় আবারো ফোন বেজে ওঠে সঞ্জুর। দৌড়ে গিয়ে দেখেন স্বামীর ফোন। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হল মন্টু হাসপাতালে। দৌড়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখেন মন্টুর সারা শরীর ঝলসে গেছে। স্ত্রীকে দেখে মন্টু শুধু একটা কথাই বলেছেন ,ক্ষমা করে দিও, আসতে পারলাম না। তারপর থেকে একটানা স্বামীর শয্যার পাশে ছিলেন সঞ্জু। প্রার্থনা করেছেন স্বামীর সুস্থতা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। গত শুক্রবার সকালে সঞ্জুর হাতে মাথা রেখে চলে গেলেন মন্টু পাল।
একই দিন গভীর রাতে মারা যান সিএনজি চালক আসাদ গাজী (৩৩)। গত ৪ নভেম্বর রাতে সাভার নবীনগর এলাকায় কয়েকজন পিকেটার আসাদ গাজীর সিএনজি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। মুহূর্তে আগুন পুরো সিএনজিতে ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর আহত হয় চালক ও দুই যাত্রী। স্থানীয় লোকজন তাদেরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে ভর্তি করে। একদিন পর সিএনজি যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান মারা যান। সিএনজির যাত্রী হাসু মিয়াও (৪০) বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। তার অবস্থাও আশংকাজনক।
নিহত আসাদ গাজীর বাড়ি পটুয়াখালী বাউফল উপজেলার বুড়িপাশা গ্রামে। তার চার বছর বয়সী একটি ছেলে ও ১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট আসাদ। তার একার আয়ে চলতো সংসার। আসাদকে হারিয়ে পুরা পরিবার যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। স্ত্রী মজিনা স্বামীর কফিন ধরে বার বার চিত্কার দিয়ে বলে উঠেন, এখন আমাদের উপায় কি? কি করে বাঁচবো? গতকাল ময়না তদন্ত শেষে আসাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছে।
তাঁতীবাজারে স্বর্ণের দোকানে কাজ করতেন মন্টু। সপ্তাহের ছয়দিনই তাকে থাকতে হত দোকানে। মাত্র একদিন যেতেন বাসায়। স্ত্রীকে সময় দিতে পারতেন না। এ নিয়ে মনে একটা আক্ষেপ কাজ করতো সব সময়ই।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার ঢাকা থেকে মন্টুর লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হলে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিল বাড়ির আশপাশে। তার স্ত্রী সঞ্জু, বৃদ্ধা মা মিনু পাল, দুই ভাই,আত্মীয়-স্বজন এবং এলাকাবাসির বুক ফাটা কান্নায় ও চোখের পানিতে চারপাশের বাতাস ভারি হয়ে আসছিল।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ৩ নং ফতেপুর ইউনিয়নের হাট ফতেপুর গ্রামে মন্টু পালের গ্রামের বাড়ি। তার পিতার নাম মৃত বিজয় কুমার পাল এবং মাতার নাম মিনু পাল। তিন ভাইয়ের মধ্যে নিহত মন্টু পাল ছিল সবার ছোট।
