ছোটবেলায় দুরন্তপনার শীর্ষে ছিল ছেলেটি। পাড়ার এমন কোনো ছেলে ছিল না যে শচীনের হাতের দু-একবার মার খায়নি। বাবা শখ করে ছেলের নাম একজন বিখ্যাত সংগীতশিল্পীর নামানুসারে রাখলেও ছোটবেলায় সংগীতের প্রতি তার কোনো টান ছিল না। ভবিষ্যতে যে ক্রিকেটেশ্বর হবে ছেলেবেলায় ক্রিকেটের প্রতিও তার কোনো আগ্রহ ছিল না। শচীন টান অনুভব করতেন টেনিসের প্রতি। টানটা যেনতেন নয়। ব্যাপক টান। কিন্তু বড় ভাই অজিত তার দুরন্তপনায় অতিষ্ঠ হয়ে শচীনকে ক্রিকেটের প্রতি টানতে থাকেন। তার ধারণা ছিল ক্রিকেট খেলায় শচীন মজা পেলে হয়তো দুরন্তপনা কিছুটা হলেও কমবে। তাই ছোট ভাইকে ক্রিকেটে হাতেখড়ি দেন অজিত। ১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল শচীন টেন্ডুলকারের। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছরের ক্যারিয়ারে ৪৬৩টি একদিনের ম্যাচ খেলেছেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ৪৯টি শতক ও ৯৬টি অর্ধশতক দিয়ে সাজানো বিস্ময়কর ক্যারিয়ারে ১৮,৪২৬ রান এসেছে টেন্ডুলকারের ব্যাট থেকে। একদিনের ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে দ্বিশতক করার অবিস্মরণীয় কৃতিত্বটিও নিজের দখলে নিয়েছিলেন ভারতের ক্রিকেট দেবতা। এ বছরের মার্চে এশিয়া কাপে শেষবারের মতো ওয়ানডে ম্যাচের রঙিন জার্সি গায়ে টেন্ডুলকারকে দেখতে পেয়েছিলেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। সেখানেই বাংলাদেশের বিপক্ষে ইতিহাসগড়া শতকটি করেছিলেন লিটল মাস্টার। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শততম শতকটি পূর্ণ করে শুধু নিজেকে বা দেশকে নয়, পুরো ক্রিকেট বিশ্বকেই তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন নতুন উচ্চতায়। তারপর এই অবিস্মরণীয় ও প্রায় অলঙ্ঘনীয় কীর্তিটিকে সম্মান জানিয়ে গত মে মাসে টেন্ডুলকারকে নিজেদের প্রচ্ছদে তুলে এনেছিল টাইম ম্যাগাজিন। এবার বর্ণাঢ্য ক্রিকেট ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তির পর শচীনকে আকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানিয়েছে আমেরিকার শীর্ষ এই পত্রিকাটি। শচীনের একটি অন্যতম প্রধান বিশেষত্ব এই জায়গায় যে, ২৩ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি শুধু নিজেকেই না, পুরো ক্রিকেট খেলাটাকেই নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন একেরপর এক বিস্ময়কর মাইলফলকের সঙ্গে। আর আগামী প্রজন্মের কাছে রেখে গিয়েছেন সেই প্রায় অলঙ্ঘনীয় রেকর্ডগুলো ভাঙ্গতে পারার আহ্বান। ক্রীড়াজগতের অন্যান্য অঙ্গনে অনেক খেলোয়াড়েরই অনেক উত্থান-পতন দেখা গেছে, অনেক নতুন নতুন তারকার আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু ক্রিকেটে শচীন টেন্ডুলকার যেন এক দীর্ঘস্থায়ী নাম। সময় যেন আসলেই থমকে আছে শচীনের সামনে। কিংবদন্তি এই ব্যাটসম্যানের এই খেলোয়াড়ি জীবনের বিস্ময়কর স্থায়িত্ব স্মরণ করেই হয়তো টাইম ম্যাগাজিনের নিজেদের ওয়েবসাইটে বলেছে, ‘যখন শচীন টেন্ডুলকার পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তত্কালীন ক্রিকেটের অন্যতম সেরা বোলিং আক্রমণের মোকাবিলা করতে তখন মাইকেল শুমাখার কোনো ফরমুলা ওয়ান রেসে অংশ নেননি, ল্যান্স আর্মস্টং ফ্রান্স ট্যুরে পা রাখেননি, ডিয়েগো ম্যারাডোনা তখন শুধুই বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক আর পিট সাম্প্রাস তখনও একটি গ্রান্ড স্ল্যামও জেতেননি। টেন্ডুলকার যখন ইমরান খানদের দুর্দান্ত ডেলিভারিগুলো সামলাচ্ছেন, তখন কেউ রজার ফেদেরারের নামও শোনেনি। লিওনেল মেসি ছোট্ট শিশু, উসাইন বোল্ট জ্যামাইকার একটা অজানা ছেলে, বার্লিন দেয়াল তখনও অটুট, সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা বিশাল বড় দেশ, ড. মনমোহন সিং তখনও কোনো নেহেরুপন্থী অর্থনীতির সূচনা করেননি।’ সময়ের সেরাকে আদর্শ মেনে তরুণরা বেড়ে উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। ব্যতিক্রম ছিলেন না এ সময়ে কোটি কোটি মানুষের নায়ক শচীন টেন্ডুলকারও। আবার ছিলেনও—একজন নয়, শচীনের আদর্শ যে ছিলেন দুজন। তার শৈশবের সেরা দুই তারকা ভিভ রিচার্ডস ও সুনীল গাভাস্কারের মিলিত রূপ নিজের মধ্যে দেখতে চেয়েছিলেন কয়েক দিন আগে চল্লিশে পা দেওয়া ভারতের এ কিংবদন্তি, ‘প্রত্যেক মানুষ নিজের পরিচয় পছন্দ করে এবং এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমি বড় হচ্ছিলাম, তখন আমার বেশ কয়েকজন আদর্শ ছিল। আমি নিজেকে সুনীল গাভাস্কার ও ভিভ রিচার্ডসকে মিলিয়ে তৈরি করতে চেয়েছিলাম।’ ছেলেবেলার সেই হিরো গাভাস্কার-রিচার্ডসদেরও ছাড়িয়ে টেন্ডুলকার নিজেই এখন ক্রিকেট দুনিয়ার এক আইকন। এখনকার তরুণরা হতে চায় তার মতো। কিন্তু সেটা হওয়ার উপায় কী? ভক্তদের জন্য টেন্ডুলকারের পরামর্শ, ‘বড় কথা হচ্ছে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। কত সময় অনুশীলন করতে হবে—এটা ঘণ্টা মেপে বলা যাবে না। কতটা বল করা হয়েছে তাও গোনা যাবে না। আসলে অনুশীলনে গিয়ে ঘড়ি দেখাও যাবে না। অনুশীলন আর অনুশীলন। এর কোনো বিকল্প নেই। তবে প্রথম কথা হচ্ছে, খেলাটা হূদয়ে থাকতে হবে। অন্যগুলো এমনিতেই হয়ে যাবে।’ শচীন টেন্ডুলকার তার প্রজন্মের একমাত্র ক্রিকেটার ও একমাত্র ভারতীয় যিনি আরেক লিজেন্ড ব্র্যাডমেনের সেরা একাদশে স্থান পেয়েছেন। শচীন যে শুধুমাত্র সাধারণ দর্শকদের কাছেই পূজনীয় তা নয়, ক্রিকেটের অন্য গ্রেটদের কাছে তিনি একজন গ্রেট!! ম্যাথু হেইডেন একবার বলেছিলেন, ‘আমি ঈশ্বর দেখেছি। তিনি ভারতের টেস্ট দলে ৪ নম্বরে ব্যাট করেন!!’ ইয়ান চ্যাপেল বলেছিলেন, ‘শচীন যে পরিস্থিতিতে খেলে, যে চাপ নিয়ে খেলে আমি খেলাই ছেড়ে দিতাম!’ শচীনের বাবা রাজাপুর সরস্বতী ব্রাহ্মণ পরিবারের বড় ছেলে, নাম রমেশ টেন্ডুলকার। পেশায় ছিলেন একজন ঔপন্যাসিক। মা রাজোনি, যিনি কাজ করতেন একটি জীবন বীমা কোম্পানিতে। লেখালেখি করার কারণে রমেশ টেন্ডুলকারের গানের প্রতি বেশ ঝোঁক ছিল। আর তার প্রিয় শিল্পী ছিলেন শচীন দেব বর্মণ। তাই প্রিয় শিল্পীর নামানুসারে বাবা রমেশ টেন্ডুলকার ছেলের নাম রাখলেন শচীন। এবং শচীন রমেশ টেন্ডুলকার থেকে পরবর্তীতে শচীন টেন্ডুলকার হিসেবে ইতিহাস খ্যাত হোন।
