সততা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে কেউ সফলতাকে হাতের মুঠোয় পুরতে পারেন। তেমনি একজন আমাদের ক্রীড়া অঙ্গনের সফল প্রজন্ম গলফার ছিদ্দিকুর রহমান। তার বয়ানে, ‘আমি একসময় গলফ মাঠে বল কুড়ানোর কাজ করতাম। সেই সময় থেকেই গলফ খেলার প্রতি খুব আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। পরে খেলায় আরও মনোযোগী হলাম এবং সাধনা করতে থাকলাম। পরে এই ক্লাব থেকে সাভারের ক্লাব খেলতাম।’ ছিদ্দিকুর একজন সাধারণ পরিবারের ছেলে। তারপরও নিজের চেষ্টায় আজ বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বে তুলে ধরেছেন গলফ খেলার মাধ্যমে। আমরা জানতে চেয়েছিলাম তার পরিবার সম্পর্কে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা-মাকে আমি অনেক ভালোবাসি। তারাও আমাকে খুব ভালোবাসে। আব্বা-আম্মা, ভাই-ভাবি, ছোটভাই সবাই একসাথে আছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘গলফ ধনীদের খেলা এটা সত্যি, অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আসলে অরিজিনাল প্রফেশনাল গলফ প্লেয়ার কোথা থেকে আসছে। সেদিক থেকে তাকালে ঠিক সেই কাজই করছে আমাদের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব, সেটাই ফলো করছে গত দশ বছর থেকে। আমি বলব আমাদের এখানে যত স্পোর্টস আছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অ্যাচিভমেন্ট গলফেই আছে।’ বর্তমানে বাংলাদেশের গলফ অনেক এগিয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের ক্লাবের প্রচেষ্টা ও ফ্যাসিলিটিজ অনেক বেড়ে গেছে, তাই অ্যাচিভমেন্ট অনেক ভালো হচ্ছে। আমাদের এখানে প্রতিবছর বিদেশ থেকে ট্রেইনার আনা হচ্ছে।’ সম্প্রতি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সাড়ে ১২ লাখ মার্কিন ডলার প্রাইজ মূল্যের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হিরো ইন্ডিয়ান ওপেন গলফের শিরোপা জিতলেন ছিদ্দিকুর রহমান। তীব্র লড়াইয়ের পর ভারতের অর্নিবাণ লাহিড়ি, ফিলিপাইনের অ্যাঞ্জেলো কুই ও ভারতের এসএসপি চৌরাসিয়াকে হারিয়ে এককভাবে শীর্ষস্থান লাভ করেন দেশসেরা এই গলফার। সব মিলিয়ে পারের থেকে ১৪টি শট কম খেলেছেন তিনি। আর পারের চেয়ে ১৩টি করে কম শট খেলে ইন্ডিয়ান ওপেনে যৌথভাবে দ্বিতীয় হয়েছেন ভারতের অর্নিবাণ লাহিড়ি ও এসএসপি চৌরাসিয়া। ছিদ্দিকুর ২০১০ সালে ব্রুনাই ওপেন জয়ের পর দ্বিতীয় শিরোপা হিসেবে ইন্ডিয়ান ওপেনের খেতাব হাতে ওঠালেন। দিল্লিতে হিরো ইন্ডিয়ান ওপেন গলফের শিরোপা জেতার অনুভূতি প্রসঙ্গে সিদ্দিকুর বলেন, ‘এখানে জিততে পেরে আমি খুব খুশি। এটাও সত্য ক্যারিয়ারের সেরা খেলাটাই এখানে খেলেছি আমি। আমি চাপ নিতে চাইনি তবে বেশ কিছু বাজে শট আমাকে চাপের মধ্যে ফেলেছিল। তবে ওই মুহূর্তেও আত্মবিশ্বাস হারাইনি। আমার সব সময়ই মনে হচ্ছিল আমি জিততে পারি। তবে ১৭ নম্বর হোলের ওই বার্ডিটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চার শটে এগিয়ে থাকলেও শেষ রাউন্ডের আগে আমি জানতাম এই কোর্সে অনির্বাণ ও চৌরাশিয়া যেকোনো সময় ভালো করতে সক্ষম। আর এ কারণেই রক্ষণাত্মক না হয়ে আমি আগের মতোই আক্রমণাত্মক খেলে গেছি।’ গত তিন বছরে শিরোপা না জেতার দুঃখ দূর করতে পেরে উচ্ছ্বসিত ছিদ্দিকুর আরও বলেন, ‘ব্রুনাইয়ে ২০১০ সালে শিরোপা জেতার পর আমি প্রতি মুহূর্তেই পরবর্তী শিরোপার জন্য চেষ্টা করে গেছি। তবে সেটা হয়নি। এরপরও আমি নিজেকে বলেছি আমার জন্য বড় একটি শিরোপা অপেক্ষা করছে। আর সেই বড় শিরোপাটাই আমি পেলাম।’ আরেকটি সুখের খবর হলো দেশসেরা এই গলফার এবারই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য গলফের বিশ্বকাপেও অংশগ্রহণ করবেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। আগামী ২১ থেকে ২৪ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। এই আসরে ছিদ্দিকুর রহমানের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গলফ বিশ্বে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার পথে এক নতুনমাত্রা যোগ করবে। এই প্রতিযোগিতায় ছিদ্দিকুরের প্রত্যাশা—এবার প্রথমবারের মতো অংশ নেওয়া বিশ্বকাপ গলফে সেরা বিশে আসা। বাংলাদেশের গৌরব ছিদ্দিকুর নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘প্রতিটি মানুষের মাঝে সততা, ইচ্ছা, সাধনা-এই তিনিটি জিনিস থাকা দরকার। সাধনার মাধ্যমেই আমার আজকের এই অ্যাচিভমেন্ট। তাই প্রত্যেকে সফলতার জন্য এটা করা উচিত।’ ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের স্বপ্ন কখনও একটা থাকে না। ধাপে ধাপে স্বপ্ন তৈরি হয়। প্রথমে স্বপ্ন ছিল বড় ভাইদের মতো খেলোয়াড় হওয়া, পরে সেটা পূরণ হলে স্বপ্ন দেখেছি ইন্ডিয়ান খেলোয়াড়দের সাথে খেলার। যখন ইন্ডিয়াতে চ্যাম্পিয়ন হলাম, তখন স্বপ্ন দেখলাম এশিয়ান ট্যুরে খেলতে পারলে ভালো হতো। এরপর এশিয়ান ট্যুরেও চ্যাম্পিয়ন হলাম। এবার স্বপ্ন আরও বড় কিছু করা। আমি কনফিডেন্ট, আমি পারব। সেই সাথে আমি দেশের গলফের জন্য একটা কিছু করতে চাই। আমার ইচ্ছা আছে একটা গলফ একাডেমি করার। যেখান থেকে প্রতি বছর কোয়ালিটি প্লেয়ার বের হবে। সেটা আমি চালাব। আমার ইচ্ছা আছে, আমি যেটা প্রাইজমানি পাব, তার একটি অংশ একাডেমিতে দেব। যারা ভালো প্লেয়ার তাদের প্রশিক্ষণ দেব। তারা যেন বিদেশে খেলে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে পারে।’
