প্রজন্ম মুখ

সৃষ্টিশীল একজন

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৮
প্রতিটি মানুষেরই একটি গোপন স্বপ্ন থাকে। স্বপ্নের সাথে সাধনা যোগ হলে রচিত হয় সাফল্যের গল্প। আজকের এই ডিজাইন পেশার নিবেদিতপ্রাণ জুয়েল জুবিন সেই স্বপ্ন ও সাধনার সেতু বেয়ে বর্তমান অবস্থানে এসেছেন। ভাগ্য বরাবরই তার পক্ষে পাল তুলেছে। পরিবার থেকে প্রতিবেশী, শিক্ষক থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার অগ্রযাত্রাকে অগ্রগণ্য করে তুলেছে। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে পুরান ঢাকায়। তার কাছে শৈশব-কৈশোর গল্প জানতে চাইলে তিনি ভাবনার আকাশে পাড়ি দিয়ে কিছুটা সময় হারিয়ে গেলেন। সেখান থেকে ফিরে মৃদু হেসে মেলে ধরলেন তার ফেলে আসা দিনের গল্পের ঝাঁপি। তার ভাষ্যে, ‘আমার বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। আমি তখন স্কুলে পড়ি। আমার জন্য বঙ্গবাজার থেকে কিনে আনা হলো একটি লাল রঙের স্যান্ডেল। আমার ভালো লাগেনি সেই স্যান্ডেলটি। বাবার জুতার ফ্যাক্টরি ছিল। সেই স্যান্ডেলটি নিয়ে চলে যাই সেখানে। সেটা বদলে বাবার ডিজাইন করা জুতা থেকে খুঁজে নিই একটা। সেটাও আবার নিজের মনের মতো করে ঠিকঠাক করে নিয়েছিলাম। আসলে তখন থেকেই ব্যতিক্রমী সবকিছুতেই আমার আগ্রহ ছিল। সেটা যে সু-ডিজাইনার হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে এই নিয়েও তখন সুনিশ্চিত ছিলাম না। দেখতে দেখতে কেমন করে যেন ডিজাইনার হয়ে গেলাম। জুতার ফ্যাক্টরি করলাম।’ আসলে সু-ডিজাইনার হিসেবে খুব প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাও তার নেই, তবুও যে নিজের ইচ্ছা আর আগ্রহেই অনেক কিছু সম্ভব সেটার দৃষ্টান্ত তিনি নিজেই। দেশ-বিদেশের ফ্যাশনের খোঁজখবর, তরুণদের চাহিদা আর নিজের ফ্যাক্টরিতে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তাকে সু-ডিজাইনার করেছে। বর্তমানে তার ডিজাইন করা জুতাই ঢাকা শহরের বড় বড় ফ্যাশন হাউসগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে, ‘জুবিন জিরো পারসেন্ট’-এর জুতা-স্যান্ডেল তাদের পছন্দের তালিকায় তার নাম শীর্ষে। জুবিন আরও বলেন, ‘নিত্যনতুন ফ্যাশনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা চাই, নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখা চাই। সেই প্রণোদনাতেই প্রথমে নিজের জন্য জুতার নকশা শুরু করেন, তারপর বাবার ফ্যাক্টরিতে যেগুলো তৈরি হয় সেগুলোরও। আর জুবিন আগ্রহ ভরে খেয়াল করেন, মানুষ যখন দেশেই ভালো মানের পণ্য পাচ্ছে, তখন সেটাতেই মার্কেটিং তথা নিজের ব্র্যান্ডকে পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে। এই ভাবনাতেই জুবিন জিরো পারসেন্ট নামে তার ডিজাইন বাজারজাত শুরু করেন। তার সৌভাগ্য, এই আন্তরিকতা বৃথা যায়নি। তরুণ প্রজন্ম সানন্দে গ্রহণ করেছে তার কাজ। প্রাথমিকভাবে শহরের নামীদামি ফ্যাশন হাউসগুলোতে তার ডিজাইন করা সু-গুলো বিক্রি হয়ে আসছে। জুবিনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এই যে নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে কাজ শুরু করলেন, প্রতিবন্ধকতাগুলো কীভাবে সামাল দিলেন? জুবিনের কথায় স্পষ্টতই প্রমাণিত যে, তিনি নিজেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার মতো যোগ্যতা রাখেন। যখন পড়াশোনার পাশাপাশি এগুলো করেছেন তখনও এবং এখনও কর্মজগতে এসে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন থেকে শুরু করে বিপণন, নকশা সবই তার করতে হয়েছে। বাবার অভিজ্ঞতা আর তার তারুণ্য—এ দুইকে কাজে লাগিয়েই এই সাফল্য লাভ হয়েছে বলে জানান তিনি। বাবা এখনও তাদের প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমাদানির বিষয়টা দেখছেন, সেটা তার জন্য সহায়কই বটে। ছেলেদের স্যান্ডেলের নানা বাহার নিয়ে ‘জুবিন জিরো পারসেন্ট’-এর স্বত্বাধিকারী ও সু-ডিজাইনার জুয়েল জুবিন বলেন, ‘সময়ের সাথে চলনসই অর্থাত্ যখন যে ট্রেন্ড চলে সেই অনুযায়ী আমরা স্যান্ডেলের ডিজাইন করি। প্রতিমাসে আমরা এই ডিজাইন নিয়ে ডিজাইনারদের সাথে কথা বলি এবং প্রতিটি ডিজাইনে ভিন্নতা আনার চেষ্টা করি। এ ছাড়া আমরা যেহেতুে হোলসেল করি তাই ক্রেতাদের পছন্দমাফিক কিছু ডিজাইনও করতে হয়। যার চাহিদা যে রকম সে অনুযায়ী ডিজাইন করে থাকি। আর আমি নিজেও যেহেতু একজন ডিজাইনার তাই স্যান্ডেলের ডিজাইন নির্বাচনে সব সময় একটা কথা মাথায় রাখি, তা হলো—সারাদিন পায়ে থাকবে, সেজন্য স্যান্ডেলটা যেন অবশ্যই স্বাচ্ছন্দ্যে পরা যায়।’ রাজধানীর বসুন্ধরা সিটিতে নিকনেক ও ফগড্রপ, এলিফ্যান্ট রোডের কার্টিয়াক সুজ, উত্তরার মাসকট প্লাজার নো মার্সি, পলওয়েল মার্কেটে এটিসি, মেনজক্লাব, এইচকে এন্টারপ্রাইজ, ফেলোসহ বিভিন্ন শপিং মলের নানা স্যান্ডেলের আউটলেটে জুবিন জিরো পারসেন্ট কোম্পানির নান্দনিক ডিজাইনের স্যান্ডেল পাওয়া যায়। বাবা-মা আর দুই বোন নিয়ে জুবিনের পরিবার। পুরান ঢাকার হাম্মাদিয়া স্কুল থেকে এসএসসি, এরপর ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি দিয়ে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ শেষ করেন তিনি। এখন শুধুই নিজের ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিজীবনটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা তার। জুবিনের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা হলো, খুব শীঘ্রই নিজের আউটলেট করবেন। যাতে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়াতে পারেন। জুয়েল জুবিন জন্মতারিখ ও স্থান :৪ অক্টোবর, ঢাকা মায়ের নাম : হাবিবা খাতুন বাবার নাম :নূরুল হক প্রথম স্কুল :হাম্মাদিয়া হাই স্কুল প্রিয় মানুষ :বাবা-মা প্রিয় উক্তি :চেষ্টা করে যাও, প্রতিভাকে অতিক্রম করতে পারবে। প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :বন্ধুদের সাথে আড্ডায় সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম, আত্মত্যাগ আর কাজের প্রতি অনুরাগ।