বয়স ৪০। এর মধ্যে ক্রিকেটের সঙ্গেই বসবাস ২৯ বছর ধরে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারই তো ২৪ বছরের। সেই ১১ বছর বয়সে যে ক্রিকেট ব্যাটকে নিজের সঙ্গী বানিয়েছিলেন ৪০ বছরে এসে গত শুক্রবার তাকে গুডবাই জানালেন। আর এরই মধ্যে করে ফেলেছেন ক্রিকেটের বিশ্বজয়। ২৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বিশ্বের প্রায় সব ক্রিকেট রেকর্ডই তাঁর দখলে। হ্যাঁ তিনিই শচীন টেন্ডুলকার। ক্রিকেটের মহারাজা। গত শুক্রবার টানা সাফল্যের দীর্ঘ ইনিংসের যবনিকাপাত হয়েছে। বিদায় নিয়েছেন ব্যাট-বলের কাছ থেকে। আর ক্রিকেটের মাঠে দেখা যাবে না ক্রিকেটে কিংবদন্তি তুল্য শচীনকে। ব্যাট হাতে ঝড় তুলে কাঁপিয়ে তুলবেন না বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী দর্শকদের। তবে ক্রিকেট ইতিহাসে সব সময়ই জ্বলজ্বল করতে থাকবে ওই নামটি।
৪০ বছর বয়সে তুমুল ফর্মের মধ্যে খেলা থেকে অবসর নিয়ে এখন কি করবেন শচীন? ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর এখন কোন ভূমিকায় দেখা যাবে ভারতের এই ক্রিকেট দেবতাকে? কারণ ক্রিকেট তারকাদের অনেককেই তাদের খেলোয়াড়ি জীবনে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। কিন্তু শচীন ছিলেন এসব বিতর্কের উর্ধ্বে। কোনো ধরনের বিতর্কই স্পর্শ করতে পারেনি তাঁকে। বরং একের পর এক বিস্ময়কর সাফল্য স্পর্শ করলেও শচীন থাকতেন সব সময় একজন বিনয়ী মানুষ হিসেবে। খেলার মাঠে কিংবা বাইরে কোথাও রাগতে দেখা যায়নি শচীনকে।
কিন্তু সেই টেন্ডুলকারকে গত জুনে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকেই। সারা জীবন খেলোয়াড়ি জীবন শেষে হঠাত্ করে কেন তিনি রাজনীতিতে নামলেন। এ প্রশ্ন শচীন এবং ক্রিকেট ভক্ত অনেকের মনেই দেখা দিয়েছিল সে সময়। তবে সাংসদ হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় শচীন টেন্ডুলকার বলেছিলেন, ‘শুধু ক্রিকেটই না, দেশের সব ধরনের খেলাধুলার উন্নতির জন্য কাজ করার সুযোগ আছে আমার। শুধু ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যানের জন্য না, পুরো ক্রীড়া জগতের অগ্রগতিতে অবদান রেখে স্মরণীয় হতে পারলে আমি বেশি খুশি হবো।’
ভারতের ক্রীড়া মন্ত্রী হতে পারলে নিশ্চয়ই গোটা ক্রীড়া জগতের জন্যই অবদান রাখতে পারবেন টেন্ডুলকার। এটা সত্য। ইতোমধ্যে এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েও ফেলেছেন ভারতের আরেক কিংবদন্তি অ্যাথলেট মিলখা সিং। টেন্ডুলকারকে অবসরের পর অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্রীড়া মন্ত্রীর আসনে বসানোর সুপারিশ করেছেন এই অ্যাথলেট। ৪০ বছরে অবসর নিয়ে রাজনীতির ইনিংস শুরুর পরিকল্পনা শচীনের মনে আছে কি না তা কে জানে। কারণ ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়ে বসে বসে তো আর জীবন কাটাতে পারেন না তার মত বিশ্ব তারকা।
কেউ কেউ বলছেন, অবসরের পর হয়তো তিনি ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করতে পারেন। এ ধরনের অসংখ্য প্রস্তাব তার কাছে আসবে নিশ্চয়ই। ইতোমধ্যে তা আসতে শুরু করেছে বলে মনে করেন অনেকেই। কারণ ক্রিকেট তিনি জানেন আগা-গোড়া সব দিক থেকেই। কারণ বিশ্ব সেরা বেশ কয়েকজন সাবেক ক্রিকেট তারকা—সুনীল গাভাসকার, রবি শাস্ত্রী, সৌরভ গাঙ্গুলীও অবসরে ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার হিসেবে অনেক সময় কাজ করেন। কিন্তু শচীন কি ওই পথে হাঁটবেন?
শচীনকে নিয়ে ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কপিল দেবের প্রত্যাশাটা অবশ্য একটু ভিন্ন। তাঁর মতে, আপাতত মন্ত্রিত্ব কিংবা রাজনীতির গুরুদায়িত্বের মধ্যে না গিয়ে শচীনের উদীয়মান খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। এতে করে শচীনের ক্রিকেট জগতের অমূল্য অভিজ্ঞতাগুলো তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। কারণ তরুণ খেলোয়াড়রা শচীনের পরামর্শগুলোর প্রতিটি শব্দ মনের মধ্যে গেঁথে নেবে। কপিলের মতে শচীনের ক্রিকেট ইনিংস শেষ হলে জীবনের অনেক পথ বাকি রয়েছে। তাই তার জীবনে অনেক সুযোগ আসবে সম্ভাবনার এ বরপুত্রের।
টেন্ডুলকারকে ক্রিকেটের কোচিং দুনিয়ায় আসার আহ্বান নিশ্চয়ই কপিল দেবের মতো আরও অনেকেই জানাবেন। কিন্তু ভবিষ্যতে শচীন কী করবেন তা শুধু সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত অবসরের শুরুটা যে তিনি স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ পুরো পরিবার নিয়ে কাটাবেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে শচীন পরিবারে তাঁকে নিয়ে নানা আনন্দ আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। যাতে করে ক্রিকেট ছাড়ার কষ্ট তাকে বিষণ্ন করে তুলতে না পারে।
