সকালটা আজ ভারি সুন্দর, চারদিকে হালকা রোদ, দূরে আবছা কুয়াশা। গাছে কিচিরমিচির করে কত পাখি ডাকছে। এমন সময় দীপ্তকে মা ডাকছেন ঘুম থেকে উঠার জন্য। প্রতিদিন সকালে মা দীপ্তকে স্কুলে যাবার জন্য ডেকে তোলেন। আজ কী ঠান্ডা! আরামে চাদর গায়ে ঘুমিয়ে ছিল দীপ্ত। মায়ের ডাকে দীপ্ত চোখ বহু কষ্টে খুলল। স্কুলের জন্য তৈরি হল দীপ্ত। মা দীপ্তকে জানালেন স্কুলের বন্ধে ৩ দিনের জন্য ওরা গ্রামে যাবে বেড়াতে। কিন্তু দীপ্ত কখনো গ্রামে যায়নি। তবে বইয়ে গ্রাম সম্পর্কে পড়েছে। তাও তার এখন গ্রামে যেতে ইচ্ছে করছে না। বন্ধুদের কাছে শুনেছে গ্রামে শহরের মত তেমন বিদ্যুত্ নেই, কমিকসও দেখা যায় না। তাছাড়া গ্রামের কাউকে সে চেনে না। গ্রামে শুধু তার নানা, নানু থাকে। তবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্কুলের বন্ধে সে বাবা মায়ের সাথে গ্রামে গেল। গ্রামে গিয়ে তো সে অবাক। গ্রামের গাছপালা, নদ-নদী, বন, বাড়ি-ঘর সবই খুব সুন্দর। একথা না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। বাবা দীপ্তকে দেখে জিজ্ঞেস করল তার কেমন লাগছে। সে বাবাকে জানাল গ্রামের সব কিছুই দেখতে খুব সুন্দর। মা বলল, সুন্দর লাগবে না, এমন প্রকৃতি হেমন্ত ছাড়া আর কখনো দেখা যায় না। এখন হেমন্ত ঋতু।’ চারদিকে কোমল বাতাস। ক্ষেতভর্তি পাকা রাশি রাশি ঝলমলে সোনালি ধান। দীপ্ত নানা বাড়ি পৌঁছে দেখে উঠান ভর্তি ধান। চারদিকে চলছে ধান মাড়াই ও ঝাড়াই। প্রত্যেকটি বিষয় বাবা-মা দীপ্তকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। দীপ্তর খুবই ভালো লাগল। এরপর বিকালবেলা মা-বাবার সাথে ধানের ক্ষেতগুলো দেখল।
হেমন্তের সময় গাছে কত ফুল বাতাসে দুলে উঠে, পাখিরা মনের সুখে গান গায়। কৃষকরা কাস্তে হাতে নদীর তীরে তীরে ধান কাটছে, আবার সেই ধান নিয়ে বাড়ি ফিরছে। পরের দিন নবান্ন উত্সব শুরু হল। দীপ্ত এই উত্সবের কথা শুধু বইয়েই পড়েছে। এই উত্সব ভারি আনন্দের। বাড়ির উঠোনে নতুন চুলোয় নতুন চালের পিঠে-পুলি, পায়েস রান্না করা হয়। ঢেঁকিতে মহিলারা ধান ভানে আর কত সুন্দর গান গায়। দীপ্তর সেই পিঠে পায়েস খুব মজা লেগেছিল। তারপর তারা শহরে বাসায় আসার জন্য প্রস্তুত হয়ে পরদিন চলে এল। দীপ্তর খুব ভালো লেগেছে, আসতে মন চায়নি। তারপর। তারপর বহু বছর কেটে গেছে, পড়ালেখার চাপে আর গ্রামে যাওয়া হয়নি। কিন্তু দীপ্তর মনে সদা উজ্জ্বল সেই সোনালি ধানের দিনগুলো। আজ বহু বছর পর সেই হেমন্তে দীপ্ত গ্রামে গেল। কিন্তু তার চোখে সেই রাশি রাশি ধান ভর্তি বিশাল মাঠ দেখা গেল না, জেলা ও উপজেলা সদরের গ্রামগুলো যেন আধা শহর। তবে সেই নবান্ন উত্সব, পিঠাপুলির বিশাল আয়োজন এখনো টিকে আছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
সুমনা আক্তার মীম, সদস্য নং-১২৭৭
গোড়ান, ঢাকা-১২১৯।
