আমি জন্মেছিলাম ১৯৫৫ সালের ৯ জুলাই (২৪ আষাঢ়) সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান বরিশাল শহরে। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী, বি.এম. কলেজের গ্রন্থাগারিক ও ইংরেজি বিষয়ের অধ্যাপক শৈলেশ্বর চক্রবর্তী। মা ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী কুন্তী রাণী চক্রবর্তী। স্বভাবতই বাড়িতে পড়াশোনার একটি পরিবেশ ছিল। আমরা তিন ভাই, এক বোন। একান্নবর্তী সংসারে মানুষ হয়েছি। আমাদের বাড়িতে থেকে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করত। তাদেরই অন্যতম ষাট দশকের কবি রবীন সমদ্দার এবং আমার অগ্রজ দীপংকর চক্রবর্তীর উত্সাহ ও অনুপ্রেরণায় আমার লেখালেখির শুরু। বাবা শিক্ষকতা ও সমাজসেবার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমি মায়ের একটু নেওটা ছিলাম বলে মা-এর অনুপ্রেরণাও কিছু কম ছিল না। ছোটবেলা থেকে বাবা আমাদের শিখিয়েছিলেন ‘plain living and high thinking’। তার জীবনে এর পরিপূর্ণতা আমরা দেখেছি। আমরা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি তা জানিনা। তবে মনে হয় বাবার সুনামটুকু রক্ষা করতে পেরেছি। বড় হয়েছি বিপ্লবী মনোরমা বসু মাসিমা এবং কমরেড নলিনী দাসের স্নেহচ্ছায়ায়। আমাদের চোখের সামনে এত বেশি সংখ্যক আইডল ছিলেন যে, তাদের মতো হয়ে উঠতে চেয়েছি।
বাবার বইয়ের বেশ কয়েকটি আলমারী ছিল। সেগুলো থেকে বই নিয়ে নাড়াচাড়া করার অবাধ স্বাধীনতা ছিল আমাদের। ফলে খুব ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়। শহরের সে সময়ের বড় লাইব্রেরির মধ্যে ইউসিস লাইব্রেরি, বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি, পাঠচক্র, আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় আমাদের বৈঠকখানায় গড়ে ওঠা ‘ঝলক পাঠাগার’, জিলা স্কুল লাইব্রেরি এসব জায়গা থেকে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল খুব ছোটবেলা থেকেই। স্কুল থেকেও স্যারেরা আমাদের এসব বিষয়ে উত্সাহিত করতেন। ১৯৬৩ সালে শিশু সংগঠন ‘মুকুল মিলন খেলাঘর আসর’-এর সদস্য হওয়ার পর সেখান থেকেও যথেষ্ট অনুপ্রেরণা পেয়েছি।
আমার প্রথম লেখা কবিতা প্রকাশিত হয় জিলা স্কুল ম্যাগাজিনে ১৯৬৮ সালে। এরপর ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে দৈনিক পয়গাম পত্রিকার ছোটদের পাতায়। এরপর সাপ্তাহিক ‘ললনা’ পত্রিকার ছোটদের পাতায়। পর্যায়ক্রমে দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক বাংলার বাণী সহ নানান পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে। সেসব দিনের অনুভূতি বোঝাবার ভাষা আমার জানা নেই। তবে প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার আনন্দের সাথে অন্য কোন আনন্দই তুলনীয় নয়। দীর্ঘকাল লেখালেখির সাথে যুক্ত আছি। কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী লেখার পাশাপাশি ছড়া লিখছি এক অন্যরকম আনন্দে। মূলতঃ শিশু সাহিত্যের প্রতি আমার এ আকর্ষণ আজও অব্যাহত। ছড়াকে নতুন ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি আজও।
আমার প্রথম ছড়ার বই ‘লাগ্ ভেল্কী লাগ’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। এ পর্যন্ত ১০টি ছড়াগ্রন্থ, ৩টি প্রবন্ধ গ্রন্থ ও ২টি কবিতা গ্রন্থ সহ মোট ১৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরে সম্পাদিত গ্রন্থও রয়েছে বেশ কয়েকটি। ছড়ার বইগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় বই ‘ছড়া সংগ্রহ’। লেখালেখির জন্য অনেকগুলো পুরস্কার বা পদক পেলেও ‘কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯’ এবং ‘অশ্বিনী কুমার দত্ত স্মৃতি পদক’ দুটি উল্লেখযোগ্য।
লেখালেখির ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যেসব অগ্রজ লেখক আমাকে উত্সাহিত করেছেন তাদের মধ্যে কবি জসীমউদদীন, আহসান হাবীব, ফয়েজ আহমদ, রণেশ দাশগুপ্ত, আবদুস সত্তার, আহমদ ছফা, আফলাতুন, দিলওয়ার, হাসান জান, হুমায়ুন কবির, আবুল হাসনাত, সেলিনা হোসেন, আসাদ চৌধুরী, সুব্রত বড়ুয়া, রফিক আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, সুকুমার বড়ুয়া, রফিকুল হক, এখলাস উদ্দিন আহমদ সহ পশ্চিম বঙ্গের কবি গণেশ বসু, কথা সাহিত্যিক মিহির সেনগুপ্ত প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। পুরস্কার আমার কাছে কোন বড় কথা নয়, অগ্রজ এবং অনুজ লেখকদের যে ভালবাসা আমি পেয়েছি তার মূল্য আমার কাছে পুরস্কারের চেয়ে অনেক বড়।
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িত আছি। বর্তমানে বরিশাল শহর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বরিশালের আজকাল’ পত্রিকার সম্পাদক। বরিশাল প্রেসক্লাবের দুই টার্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। পেশাগত জীবনে বর্তমানে বরিশাল শহরের স্বনামধন্য কলেজ ‘অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের’ অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছি। বরিশালের প্রায় সব সাহিত্যিক উদ্যোগের সাথেই সামান্য হলেও যুক্ত আছি, ভাললাগার বিষয় এটুকুই।
