এ দেশ আমাদের। এই মা, মাটি আর মানুষ আমাদের। এখানে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি। আমরা একদিন মিলেমিশে এ দেশকে সুন্দর সুখময় জন্মভূমিতে পরিণত করেছি। আমরা যুদ্ধ করেছি। রক্তাক্ত নদী পার হয়ে এসেছি। আমাদের শিক্ষা কম হয়নি। আমাদের অর্জনও কম ছিল না।
এখানে আমরা অন্যায় ও বিভেদের প্রাচীর গড়ে তুলতে পারি না। সাধারণ মানুষকে দুঃখ-দারিদ্র্যে ফেলে দিতে পারি না। তাতে সমষ্টিগতভাবে আমাদের দেশেরই ক্ষতি। আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে মিলেমিশে শান্তিতে থাকতে চাই। প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক হানাহানি, মারামারি, ধ্বংসাত্মক হরতাল সাধারণ মানুষ চায় না— এটা রাজনৈতিক নেতাদের বুঝতে হবে।
এদেশ এমনিতে সুন্দর। এদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ অতুলনীয়। কিন্তু যারা দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ লাগিয়ে মানবতাকে ভূলণ্ঠিত করছে, তাদের একদিন কৈফিয়ত দিতে হবে জাতির কাছে। সময় কোনো কিছুকেই ক্ষমা করে না। সময়ের কাছে মানুষ বড় অসহায়— আজ রাজা কাল ভিখারি। এই সোনার দেশটিকে নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলবেন না। এই ধরনের বাড়াবাড়িতে কত দেশ, কত জাতি ডুবে গেছে। ইতিহাসের কথা ভাবুন একবার।
এদেশ কারো একার নয়। এদেশ কোনো ব্যক্তি, কোনো গোষ্ঠী, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। এদেশ ষোলো কোটি মানুষের দেশ। আমাদের পূর্বপুরুষদের শ্রমে-ঘামে ভিজেছিল এ মাটি। তারা এনেছে সভ্যতা। আর আমরা এখানে কী করছি ? হরতালে বাস-গাড়ি-মানুষ পোড়াচ্ছি। সমঝোতা না করে মানুষের ক্ষতি সাধন করছি। নির্দলীয় সরকার মেনে নিলেই বা কী সমস্যা? সর্বদলীয় অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচনই মানুষের কাম্য। কে কার আগে প্রস্তাব দেবে বা দাওয়াত দেবে, নিজের প্রেস্টিজ লস হবে— এসব হীনম্মন্যতারই পরিচায়ক। গণতন্ত্রের রাজনীতিতে কমেপ্রামাইজ করে চলতে হয়।
একটা ছোট ব্যাপার নিয়ে দু’দলের ঠেলাঠেলিতে যে মানুষ মারা যাচ্ছে, দেশের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার ক্ষতিপূরণ দেবে কে ? এসব বাদ দিয়ে গঠনমূলক রাজনীতি করুন। কাজের মাধ্যমেই আপন রাজনীতির বলয় সৃষ্টি করতে হবে। জনগণের ভালোবাসা কুড়াতে হবে গদিতে বসতে হলে— এর কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্র বলে চিত্কার করেও কোনো লাভ নেই। বাংলাদেশের মানুষ এখন সচেতন।
দেশের মানুষকে আর কত জিম্মি করে রাখবেন ? যদি দেশের ভালো চান— মানুষ কীভাবে দু পয়সা আয়-রোজগার করবে, ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে একটু ঘুমাবে— যদি সে কথা ভাবেন, তাহলে দুই দল সমঝোতা করে ফেলেন। বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসে তো শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছু দেখি না। নির্বাচনেও কারচুপি হয়েছে।
কোনো প্রকার জেদি অবস্থান সংলাপে সুফল বয়ে আনে না। উভয় পক্ষকেই কিছু না কিছু ছাড় দিতে হবে, সহিষ্ণু মানসিকতা নিয়ে কথা বলতে হবে। উভয় দলের মনোনীত সদস্যগণ দ্বারা সর্বদলীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন হলে অসুবিধা কোথায় ? বরং নির্বাচন নিরপেক্ষ হতে বাধ্য।
রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে সংলাপই একটি পরীক্ষিত উপায় এবং তা অর্থবহ করে তুলতে দরকার সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি আস্থা প্রদর্শন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ঐসব পরামর্শ দুই পক্ষের কারো কাছেই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে এ ধরনের পরামর্শমূলক লেখার সংখ্যা এতই ছিল যে যা অন্য কোনো বিষয়ে চোখে পড়েছে বলে মনে পড়ে না।
জনগণের ইচ্ছার কথাই বারবার বলতে হয়— সত্যিকার সদিচ্ছা নিয়ে সংলাপে বসুন, একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছান যাতে সুষ্ঠু, পরিচ্ছন্ন ও অবাধ নির্বাচন হয় এবং গণতান্ত্রিকব্যবস্থাও বহাল থাকে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে এমন উত্কণ্ঠাই প্রবল যে যুক্তিনিষ্ঠ সমাধানে বোধহয় কোনো পক্ষেরই আগ্রহ যথেষ্ট নয়।
গ্রামেগঞ্জে প্রচলিত প্রবচন আছে যে ‘সালিস মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার’। যেন এরূপ না হয়, এতে সংলাপে বসাও কোনো তাত্পর্য বহন করবে না। ওটা লোক দেখানোর বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু জনসাধারণ এ ধরনের তত্পরতায় আগ্রহী নয়। এই সত্য রাজনৈতিক দলগুলোকে, দুই প্রধান দলের নেতা-নেত্রীকে বুঝতে হবে। এ সত্যও বুঝতে হবে যে দেশের মানুষ চায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তি আর স্বস্তি।
ঢাকা
