রাজনৈতিক সংকট, একটি প্রস্তাবনা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৩, ২৩:২০
চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট বিবদমান দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সমা-ধানের সম্ভাবনা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব নিয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কতদূর ছাড় দিতে পারে এর মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ। এর বদলেবরং দেশের কল্যাণে ও গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার বিচারে উভয়পক্ষের এককভাবে কি করণীয় আছে সেদিকে দৃষ্টি ফেরানোর সময় এসেছে। এতে করে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিচারে কোন পক্ষে আচরণ কতখানি গ্রহণযোগ্য তা জনগণের কাছে স্পষ্ট হবে এবং একটি সমাধানের পথও হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে। ক্ষমতাসীন প্রধান দলের করণীয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে প্রধানমন্ত্রী ও তার দল এক কঠিন দায়িত্বের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাদের একক প্রাধান্যের দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে সকল দলের জন্য সমান সুযোগ কী করে তৈরি করা যায় তা দৃশ্যমান করার চ্যালেঞ্জ প্রকারান্তরে তারা গ্রহণ করেছেন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা কতখানি সফলতা অর্জন করতে পারেন জনগণ এখন তা পরখ করার সুযোগ পাবে। নির্বাচনের জন্য একটি সমতল খেলার মাঠ কী করে তৈরি করতে হয় তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর সময় সবাই দেখেছে। লক্ষ্য করার মত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে আছে: চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সরকার পরিচালিত অন্যান্য গণমাধ্যমকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কাজে ব্যবহার করা, দলীয়ভাবে চিহ্নিত কর্মকর্তারা জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে তাদেরকে অনত্র সরিয়ে দেয়া, স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনে কিছু রদবদলের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার পক্ষে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়া, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে দল-নিরপেক্ষভাবে কাজ করার লক্ষ্যে কার্যকর প্রকাশ্য নির্দেশনা প্রদান এবং সর্বোপরি প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠিত করা। ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের কাছে এতখানি আশা করা না গেলেও অন্ততঃ ন্যূনতম কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ তো জনগণ অবশ্যই আশা করবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব-ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই বার বার এ অঙ্গীকার করেছেন। এছাড়া দলীয় সরকারের মন্ত্রী ও নির্বাচনকালীন সময়ে স্বপদে অধিষ্ঠিত থাকলে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি কী হবে তা নির্ধারণ করার বাড়তি দায়িত্বও আছে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় যার দরকার ছিল না। প্রধানমন্ত্রী একাধারে সরকার ও দলের প্রধান বলে তাকে একদিকে দলীয় নির্বাচনী প্রচারণার নেতৃত্ব দিতে হবে এবং অন্যদিকে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার কাজটিও করতে হবে, যা মোটেই সহজসাধ্য হবে না। উন্নত গণতন্ত্রে প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ করা হয় না বলে এ সমস্যা হয় না। এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা তার বিবেচনায় একান্তই অসম্ভব হলে নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তিনি আর কারো উপর ন্যস্ত করে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। প্রধান বিরোধী দলের করণীয় প্রধান বিরোধী দল এটা মনে করতেই পারে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের ফলে তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। কিন্তু এককভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে তাদের সামনে যে বিকল্পগুলো আছে তার মধ্য থেকেই মন্দের ভালো হিসাবে একটিকে বেছে নিতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার অঙ্গীকার পালনের জন্য সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারেন। নির্বাচন প্রতিহত করার নেতিবাচক আন্দোলনের বদলে তারা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করতে পারেন। বৈরী পরিবেশেও নির্বাচনমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তারা অবদান রাখতে পারেন এবং সেজন্য তাদের প্রতি জনগণের সমবেদনা থাকবে। অন্যদিকে নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলন থেকে যে সহিংসতা দেখা দিতে পারে তা কারো জন্য মঙ্গলজনক হবে না। বরং বিরোধী দলের ন্যায্য দাবির প্রতিও মানুষের বীতশ্রদ্ধা দেখা দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারে বিরোধী দল যোগদান না করলে এ সরকারের দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার দায়ভার তাদের নিতে হবে না। অথবা এ সরকারে যোগ দিলেও নির্বাচনের পরিবেশ গ্রহণযোগ্য না করা গেলে বিরোধী দলের সামনে সরকার থেকে পদত্যাগ ও নির্বাচন বর্জন করার বিকল্প খোলা থাকবে। আর ভোট কারচুপির মাধ্যমে তাদেরকে পরাজিত করা হলে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ জনসম্মুখে প্রকাশ করে তারা গণআন্দোলনও গড়ে তুলতে পারবেন। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে যে নির্বাচন বর্জনের চেয়ে বরং নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তুলে ধরতে পারলে সরকার বিরোধী আন্দোলন বেশি ফলপ্রসূ হয়। নাগরিক সমাজের করণীয় প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে যাবার ঘোষণা দিলে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হবে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা। দলবিশেষের প্রতি সমর্থন ও মতাদর্শের কারণে তাদের মধ্য বিভাজন থাকলেও এ দায়িত্ব পালনে কোনো মতানৈক্য থাকার অবকাশ নেই। কাজেই এটি নাগরিক সমাজের জন্যও একটি পরীক্ষা। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকারের বিষয়ে সরকার যদি আন্তরিক হয়, তবে নির্দলীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও একটি উপদেষ্টা পরিষদ নিয়োগ করতে পারে। দলীয় অনুগত উপদেষ্টাদের দিয়ে এ কাজ হবে না। উল্লেখ্য, যে বিগত সব তত্ত্বাবধায়ক সরকারই এ ধরনের নির্দলীয় বিশিষ্ট নাগরিকদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ নিয়েছিলেন। দলীয় সরকারের জন্য এ ধরনের পরামর্শ গ্রহণ তো আরো জরুরি। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অর্থনীতিবিদ, ইউনাইটেড নেশনস কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি-এর সদস্য।