আদিকাল হতে শতাব্দীর পর শতাব্দী, যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনে পশুপাখি ব্যবহূত হচ্ছে। এদের সঠিক পরিচর্যায় প্রয়োজন দক্ষ ভেটেরিনারিয়ান। ১৭৬৬ সালে পৃথিবীতে প্রথম ভেটেরিনারি শিক্ষা শুরু হলেও বাংলাদেশে এখনো অনেকেই জানে না এ শিক্ষা সম্পর্কে। এ বিষয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মতামত জানাচ্ছেন— মো. আবু হানিফ
ডা. মো. আব্দুল্লাহ আল জাবের
এমএস ফেলো, এনিমেল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। প্রথমবার সরকারি মেডিক্যালে চান্স না পেয়ে ভেটেরিনারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখনো এই বিষয় সম্পর্কে ঠিক জানতাম না। ভর্তি হয়ে আস্তে আস্তে জানতে শুরু করলাম। মেডিক্যালে একটি মাত্র প্রজাতি তথা মানুষ নিয়ে পড়তে হলেও এখানে পড়তে হয় অনেক প্রজাতি নিয়ে। আমাদের রোগী কথা বলতে পারে না। তার সাইকোলজি দেখে বুঝতে হয়। তাইতো উইল রগার বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে সেরা ডাক্তার হল ভেটেরিনারিয়ান। সে তার রোগীকে জিজ্ঞেস করতে পারে না, তাকে বুঝে নিতে হয়।’ শুধু চিকিত্সাতেই শেষ নয়, মেধাবী জাতি তৈরিতে রয়েছে ভেটেরিনারিয়ানের অবদান। নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উত্পাদনে ভেটেরিনারিয়ানের বিকল্প নেই। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের পর নজর এখন পুষ্টি নিরাপত্তায়। তাই দেশের কোটি মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা দিতে দুধ, ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ করতে দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ভেটেরিনারিয়ানরা। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ১৭টি লক্ষ্যের ৭টির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ভেটেরিনারিয়ানরা।
ইশরাত জাহান প্রমি
লেভেল-২, সেমিস্টার-২
ভেটেরিনারির গুরুত্ব কিংবা একজন ভেটেরিনারিয়ানের ডিগ্রির পিছনে ইতিহাসটা অনেকের কাছে অস্বচ্ছ। একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার হতে হলে তাকে কঠোর পরিশ্রমী ও মেধাবী হতে হয়, বিভিন্ন কঠিন বিষয়সমূহ আয়ত্ত করার পাশাপাশি প্রাণিজগতের প্রায় ২০-২৫টি প্রজাতি সম্বন্ধে জ্ঞান রাখতে হয় যা নিঃসন্দেহে খুব সহজ নয়। হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ঠুনকো বিষয় নয়। কারিকুলামের অংশ হিসেবে ভেটেরিনারি স্টুডেন্টদের ৬ মাস ইন্টার্নির পাশাপাশি মেডিক্যালের ডাক্তারদের মতো ইন্টার্নি ভাতা প্রদান করা হয়। এছাড়াও পড়াকালীন আর্থিক সহযোগিতার জন্য রয়েছে বিভিন্ন বৈদেশিক বৃত্তির সুযোগ। যা যেমন সম্মানজনক তেমনি পড়ালেখার আর্থিক চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সেনাবাহিনীতে রয়েছে ভেটেরিনারিয়ান হিসেবে চাকরির সুযোগ। যারা ডাক্তারি পেশায় যেতে চায়, তাদের নিজস্ব প্র্যাকটিস ও পেট ডক্টর হিসেবেও দেশে-বিদেশে রয়েছে সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ। কৃষিপ্রধান এ দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে এবং নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের, বিশেষ করে লাইভস্টকের যথাযথ পরিচর্যা ও আধুনিকায়নের জন্য দক্ষ ভেটেরিনারিয়ান এখন সময়ের দাবি। যারা গবেষণায় আগ্রহী কিংবা নতুন কিছু উদ্ভাবনায় পথপিয়াসী, তাদের জন্য নিঃসন্দেহে ভেটেরিনারি শিক্ষা হতে পারে প্রথম পছন্দ। নতুন প্রজন্মের জন্য ভেটেরিনারি সেক্টর একটি অভাবনীয় সুযোগের আধার।
জাকিয়া সুলতানা প্রিতী
লেভেল-২, সেমিস্টার -২
‘কেন ভেটেরিনারি পড়বো?’ না ভেবে কেন ভেটেরিনারি পড়বো? সেদিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত বলে আমি মনে করি। ভেটেরিনারি একটি ব্যয়বহুল সাবজেক্ট এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে কেবল মেডিক্যাল, ডেন্টাল ও ভেটেরিনারির শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে নামের আগে ডাক্তার বসানোর যোগ্যতা অর্জন করে। স্কলারশীপ নিয়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পড়াশোনা করা আমাদের জন্য অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে তুলনামূলকভাবে সহজ। দেশে বিসিএস ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিতে উচ্চ বেতনে চাকরির সুযোগ রয়েছে। বলা বাহুল্য, একজন ভেটেরিনারিয়ানের মাসিক আয় কোনো অংশেই অন্যান্য পেশাজীবীদের থেকে কম নয়। তাই ভেটেরিনারি শিক্ষাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। প্রাণির বিভিন্ন রোগ মানুষের শরীরে সংক্রমিত হচ্ছে বলে গবেষণায় জানা যাচ্ছে। এধরনের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার জন্য ভেটেরিনারি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে দেশকে এগিয়ে নিতে ভেটেরিনারি শিক্ষা হতে পারে সঠিক সিদ্ধান্ত।
মোঃ রাকিব খান
লেভেল-৪, সেমিস্টার -২
ছোটবেলায় ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হব; কিন্তু পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া হলো না। ভর্তি হলাম শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) এনিমেল সায়েন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদে। এই সাবজেক্টের বিস্মৃতি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। ভেটেরিনারি গ্রাজুয়েটদের চাকরি ক্ষেত্রে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রাণি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ক্যারিয়ার গড়ার অনেক সুযোগ। এছাড়াও বিসিএসের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে ভেটেরিনারি মেডিসিন গ্রাজুয়েটদের। বর্তমানে দেশের ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি কলেজ হতে ভেটেরিনারি মেডিসিনের উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। ডিগ্রির নাম ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম)/বিএসসি ইন ভেট. সায়েন্স এন্ড এএইচ। আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে এ ডিগ্রি প্রদানের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। বিদেশেও রয়েছে ভেটেরিনারিতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের অপার সুযোগ। পেশা হিসেবে ভেটেরিনারি মেডিসিন অন্য পেশার তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। উন্নত বিশ্বে ভেটেরিনারিয়ানরা যথেষ্ট সমাদৃত। বাংলাদেশেও বর্তমানে এ পেশার কদর বেড়ে চলেছে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং পেশা হিসেবে ভেটেরিনারিকে বেছে নেওয়া হতে পারে বর্তমান সময়ের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত।
