নানাজনের নানা কষ্টের কথা দিয়েই লেখা শুরু করতে চাই। সেদিন হরতাল চলছে। পথে দেখা হলো আমারই পাড়ার বিল্লাল চাচার সাথে। সংসারে কর্ম করার মতো কেউ নেই, তাই চাচা শেষ জীবনে এসেও কাজ জুটিয়ে নেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের একটি স্পিনিং মিলে। কর্মস্থলে কিভাবে যাবেন এমন চিন্তায় চাচা অস্থির। যানবাহনশূন্য সড়ক-মহাসড়ক। কেবল রিকশা আছে ক’টি। চাচার কাছে রিকশাওয়ালা ভাড়া হাঁকলেন ৪০ টাকা। টাকার অংক শুনে চাচার শরীরের তাপ বেড়ে যাচ্ছে। অতঃপর হেঁটেই ছুটলেন চাচা আমার। অর্ধপথে হট্টগোল। ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হলো। একপর্যায়ে পুলিশের ধাওয়ায় দৌড়ে পালাচ্ছেন সবাই। বয়োবৃদ্ধ চাচা দৌড়াতে গিয়েও পিছু পড়লেন। তাই যা হবার তাই হলো। দাঙ্গা পুলিশের লাঠি পেটায় চাচা জ্ঞান হারালেন। রক্তাক্ত চাচাকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে।
গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন তুহিন। আমার আপনজন। ভাল বন্ধুও। দু’দিন আগে তার মোবাইল ফোন পেয়ে সকালের ঘুম ভাঙ্গে। ‘কষ্টের কথা নিজের মানুষের কাছে বলতে পারলে নাকি কষ্ট কমে’। তার প্রথম বাক্যটাই ছিলো এমন। জানতে চাইলাম কি সেই কষ্ট? হরতাল আর সহিংস তার কারণে যথাসময়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব হয়নি বলে বিদেশি বায়ার শিপমেন্ট বাতিল করে দিয়েছে। কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হবে জানতে চাইলাম। অর্ধকোটি টাকার মত। যাই হউক আপনি কেমন আছেন? নিঃশ্বাস ফেলে জানতে চাইলেন। বললাম, ‘ভালো আছি, তবে ক’দিন আগে এক্সপোর্ট পণ্যসহ আমার ২টি কাভার্ডভ্যান সীতাকুণ্ডে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।’ কি বলেন। ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া আর পত্রিকায়তো দেখেছি? ওগুলো আপনার নাকি? সর্বনাশ হয়ে গেছে। বললাম, বাংলাদেশে তো সর্বনাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এইতো সেদিন রাজধানীর কাকরাইলে দাউ দাউ করে জ্বলছে একটি অটো সিএনজি। পাশেই দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন অর্ধ জীবন পার করা সিএনজি চালক। তাকে হরতাল সমর্থকরা বেধড়ক পিটুনি দিয়েছে। রক্ত ঝরছে কপাল বেয়ে বেয়ে। কান্নাটা তার শরীরের কষ্টের নয়। নিজের কিস্তিতে কেনা শেষ সম্বলটা চোখের সামনেই পুড়তে দেখে মনের কষ্টে কাঁদছে লোকটা। সেদিন আমিও ছিলাম রাস্তায়। জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বাসায় ফিরছিলাম।
আমরা সেদিন তার কান্না থামাতে যাইনি কেউ; নিদেনপক্ষে সান্ত্বনাটুকুও দিতে কার্পণ্য করেছি। আসলে সবাই সবার কষ্ট পুরোপুরিভাবে বুঝতে পারে না। হরতালে প্রতিদিন মানুষ মরছে। আমাদের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কতটা? যাদের স্বজন চলে যাচ্ছে, যাদের সম্পদ নষ্ট হচ্ছে তাদের মতো কি? আমার গাড়িগুলো পোড়ার পর বুঝলাম লোকটা কতটাই না কষ্ট পেয়েছে। আমি টিভি সেটে আমরা গাড়ি পুড়তে দেখে যে কষ্টটা পেয়েছি বেচারা সিএনজি চালক (মালিক) চোখের সামনে তার গাড়িটা জ্বলতে দেখে কি পরিমাণ কষ্ট পেয়েছে তা এখন উপলব্ধি করতে পারছি।
হরতাল হচ্ছে। আরও হবে। পিছু ছাড়বে না সর্বনাশা এই হরতাল। হরতালের কারণে বাংলাদেশের ১ শতাংশ পুঁজি নষ্ট হলে তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা যা দেশের মোট জিডিপির দশমিক ৯ শতাংশ।
এফবিসিসিআইয়ের হিসাবে, একদিনের হরতালে দেশের জিডিপির দশমিক ১২ শতাংশ ক্ষতি হয়। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) হিসাবে, একদিনের হরতালে এক হাজার ৫৪০ কোটি টাকার (২০ কোটি ডলার) ক্ষতি হয়। হরতালে ক্ষতির একটি হিসাব করেছে ঢাকা চেম্বারও। সংগঠনটির হিসাবে একদিনের হরতালে দেশের এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। বছরে গড়ে ৪০ দিন হরতাল হয়। সেদিক থেকে হরতালে এক বছরে ক্ষতি হয় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। একদিনের হরতালে পোশাক খাতের ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ‘হরতালে ব্যবসায়ীদের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি সারা বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’ ঢাকা চেম্বারের হিসাবে, পাইকারি বাজার, শপিং মল, শোরুম, ক্ষুদ্র ও ছোট দোকানে প্রতিদিন ৬০০ কোটি আর বছরে ২৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির দাবি, হরতালে দেশের ২০ লাখ দোকানে এ ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা। ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির হিসাবে হরতালে ১দিন অন্তত ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এখনকার হরতালে যেভাবে গাড়ি পোড়ানো হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বৈকি।
সর্বনাশা হরতালে বাংলাদেশের প্রতিদিন অন্তত কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, চলে যাচ্ছে মূল্যবান অনেক জীবন। প্রশ্ন হলো, এহেন হরতাল কি সমর্থনযোগ্য। আমি হরতালের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু ধ্বংসাত্মক হরতালের চরম বিরোধী। জানি হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে হরতালের নামে জনগণকে কষ্ট দেয়ার অধিকার কারোরই নেই। এখন যেহেতু হরতালের নামে জানমাল নষ্ট করা হচ্ছে, জ্বালাও-পোড়াও হচ্ছে, এ হরতাল সমর্থনযোগ্য নয়।
এমন হরতাল আইন করে বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশের আইন এমন, হরতালের ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলে না। আজ তাই সময় এসেছে তেমন আইন করার, একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এবং সে আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করার। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। কোন দলই তা করছে না। কারণ তারা ভাল করেই জানেন, হরতাল ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। ক্ষমতার সিঁড়িখ্যাত এই হরতাল একদিন না একদিন ঠিকই দলগুলোর প্রয়োজন হবে। আমরা এটা ধরে নিতে পারি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দেশপ্রেমের অভাব আছে! এদের সবারই মনে রাখা উচিত, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। দলের চেয়ে দেশ বড়। যে দেশে জানমাল আর সম্পদের কদর নেই; যে দেশে দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় আর দেশের চেয়ে ক্ষমতা (গদি) বড় সে দেশ সমৃদ্ধশালী হতে পারে না। আমরা এর পরিবর্তন চাই।
লেখক: সাংবাদিক
