এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমদ বলেছেন, এইচএম এরশাদ জাপাকে এক বিশ্বাসঘাতক গণধিকৃত পার্টি হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়ে এবং জাপার অধিকাংশ নেতৃবৃন্দকে অবহিত না করে কিছু সুবিধাবাদী ও দোদুল্যমান মন্ত্রিত্বলোভী নেতাকে আওয়ামী লীগের তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিত্বে আসীন করেছেন। দলের সর্বোচ্চ ফোরাম প্রেসিডিয়ামকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পার্টির গৃহীত পূর্বাপর অবস্থানের বিপরীত এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় জাপার যোগদানের পর এই বিবৃতির মাধ্যমে নিজের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানালেন কাজী জাফর। মন্ত্রিসভায় জাপার যোগদানের একদিন আগে থেকেই তিনি রাজধানীর গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। বিবৃতিতে তিনি মন্ত্রিসভায় যোগদানকারী নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য জাপা নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। পার্টির অধিকাংশ প্রেসিডিয়াম সদস্য, এমপি, ভাইস-চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে নিজের সুস্থতার পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কার্যক্রমের দিক-নির্দেশনা দেবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কাজী জাফর বিবৃতিতে বলেন, জাপার কয়েকজন নেতা আকস্মিকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে তথাকথিত নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে অংশগ্রহণ করেছেন। এ ঘটনায় শুধু আমি নই, সমগ্র জাতি হতভম্ব ও স্তম্ভিত। টেলিভিশনের পর্দায় যখন দেখি, আমাদের পার্টি ও তার নেতার বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ থুথু নিক্ষেপ করছে এবং ঝাড়ু ও জুতা নিয়ে মিছিল করছে, তখন লজ্জা ও বেদনায় হূয়দ বিদীর্ণ হয়ে যায়। জাপার লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী আজ এ ঘটনায় চরমভাবে অপমানিত ও আশাহত। নিদারুণ মনকষ্টে তারা দিশেহারা।
মন্ত্রিসভায় জাপার যোগদানের আগে এরশাদ বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতিতে কখন কি বলেছিলেন তা উল্লেখ করে দলটির প্রবীণ এই নেতা বলেন, তার এসব বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছিল এবং আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। জনগণ আশান্বিত হয়েছিল এই ভেবে যে, শেখ হাসিনার সরকার বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে একতরফাভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ষড়যন্ত্র থেকে সরে আসবে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি মেনে নেবে।
কাজী জাফর বলেন, জাপার যারা তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারে অংশগ্রহণ করেছেন নিজ নিজ এলাকার জনগণ তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। রাতারাতি ভোল পাল্টে নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেয়ায় এরশাদকে নিয়ে নানারকম ব্যঙ্গবিদ্রূপ এবং সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ফেসবুকে এরশাদকে থুথু মারার জন্য আহবান জানানো হচ্ছে। আমি মনে করি শুধু এরশাদের নয়, এটা সমগ্র জাপার জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। এখানে আমি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরশাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে চাই। সেদিন পার্টি চেয়ারম্যানের নির্দেশ নেতা-কর্মীরা সম্পূর্ণ অমান্য করে বিরোধী দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন।
তিনি বলেন, এরশাদের এহেন লজ্জাজনক এবং গণবিরোধী কার্যকলাপের বিষয়ে আমরা নিশ্চুপ থাকতে পারি না। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমরা যদি নিশ্চুপ থাকি তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। আমি এই বিবৃতির মাধ্যমে জাপার তৃণমূল পর্যায়ের সকল নেতাকর্মীর প্রতি আহবান জানাচ্ছি- আপনারা জাপার মধ্যে থাকা সরকারের অনুগত নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণ করুন।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা তলানীতে এসে ঠেকেছে। তাই নীলনকশার নির্বাচন করে পার পাবার জন্য প্রধান বিরোধী জোটকে বাইরে রেখে একটা প্রহসনমূলক নির্বাচন করার জন্য তারা আজ মরিয়া। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। দেশের বর্তমান রক্তাক্ত সংঘাত ও সংকটের একমাত্র সমাধানের পথ হলো প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ।
কাজী জাফরের বিরুদ্ধে
সাংগঠনিক ব্যবস্থা
নেয়া হবে
জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের উদ্ধৃতি দিয়ে তার প্রেস ও পলিটিক্যাল সেক্রেটারি সুনীল শুভরায় গতকাল রাতে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই ধরনের বিবৃতির মাধ্যমে কাজী জাফর আহমদ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। তিনি এই ধরনের বিবৃতি দেয়ার কোনো এখতিয়ার রাখেন না। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
