ব্র্যান্ড কনসালটেন্ট

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৩, ২০:০৫
ব্র্যান্ডিং হলো বাজারের অন্য কোনো পণ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পণ্যকে মানুষের মাঝে পরিচিত করে তোলা। যেকোনো পণ্যের ব্র্যান্ড বলতে বাজারে পরিচিত অন্যান্য পণ্য থেকে সেই পণ্যের সুনির্দিষ্ট পরিচিতি নিশ্চিত করা হয়েছে বোঝায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের উত্পাদিত পণ্যসমূহ বাজারে জনপ্রিয় করে তুলতে যারা পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাদেরকেই মূলত বলা হয়ে থাকে ব্র্যান্ড কনসালটেন্ট। এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন মেধাবী ব্র্যান্ড কনসালটেন্টদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা এবং সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র আলী আসগর ব্র্যান্ড ইনচার্জ, আকিজ সিরামিকস লিমিটেড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বিবিএ’তে পড়াশোনা করেছেন তখন থেকেই তার ব্র্যান্ডের প্রতি একটি অদম্য আগ্রহ জন্মায়। ছাত্রাবস্থাতেই চাকরি শুরু করেন অ্যাডফার্ম বুলজ আই কমিউনিকেশনে। তখন থেকেই মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের প্রতি তার ভালোলাগা তৈরি হয়। তবে যখন তিনি মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করার সুযোগ পান, তখন ইন্টার্নশিপে কাজ করার জন্য তিনি বিজ্ঞাপণী সংস্থা অ্যাডকম-এ যোগাদান করেন। অ্যাডকমে কাজ করার সময় তার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে বিভিন্ন পরামর্শ গ্রহণ এবং একটি বড় ব্র্যান্ড পোর্টফোলিও ম্যানেজ করার কারণে তার মার্কেটিংয়ের ব্যবহারিক জ্ঞান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন। প্রজন্মের মেধাবী ব্র্যান্ড কনসালটেন্ট আকিজ সিরামিকস লিমিটেডের ব্র্যান্ড ইনচার্জ আলী আসগরের ক্যারিয়ার শুরুর গল্প এটি। নিকটজনের কাছে যিনি মিরন নামেই বেশি পরিচিত। ২০১২ সালে তিনি আকিজ সিরামিকসে যোগদান করেন। ব্র্যাণ্ড নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা এবং মেধার সমন্বয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি ইতোমধ্যে ব্র্যান্ড পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে আলী আসগরের জন্ম। তিনি চট্টগ্রামের ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তার বাবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার লিমিটেডে কর্মরত রয়েছেন আর মা গৃহিণী। মা-বাবা, চার ভাই, এক বোন, স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়ে আদ্রিকাকে নিয়ে তার পারিবারিক আবহ। একজন ব্র্যান্ডিং এক্সপার্ট হয়ে ওঠার পেছনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে আলী আসগর বলেন, ‘ব্র্যান্ডিং বিষয়ে বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণ ছাড়াও এ বিষয়ক বই আর ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে থাকি সব সময় আপডেট থাকার জন্য। নিজের আগ্রহে শেখা বিভিন্ন মল্টিমিডিয়া ও গ্রাফিক্স সফটওয়্যারে দখল থাকায় এ পেশায় বাড়তি অনেক সুবিধাও পাচ্ছি।’ একজন ব্র্যান্ড কনসালটেন্টের কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্র্যান্ডিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো পণ্য বা সেবাকে সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যসহ আকষর্ণীয়ভাবে উপস্থাপন করা। যার লক্ষ্য হলো প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, মেগাসাইন, সাইনেজ, প্রেসবিজ্ঞপ্তি, কর্পোরেট ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ইত্যাদি মাধ্যম ব্যবহার।’ আলী আসগর স্বপ্ন দেখেন, আমাদের ব্র্যান্ডিং আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাবে একসময়, সেই সময়ের আশায় এই জগতের একজন হয়ে অবদান রাখতে চান তিনি। আলী আসগর ডাকনাম :মিরন জন্ম তারিখ ও স্থান :২৯ নভেম্বর, চট্টগ্রাম মায়ের নাম :আকতার জাহান বাবার নাম :আইয়ুব আলী হাওলাদার প্রথম স্কুল :ভাথুয়া মাদ্রাসা, প্রিয় মানুষ :মা ও আমার মেয়ে প্রিয় পোশাক :শার্ট, প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :সিনেমা দেখে, মিউজিক শুনে, তবলা বাজিয়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিকল্পনা অনুযায়ী সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া। === জাহিদুল ইসলাম সিনিয়র ম্যানেজার (মার্কেটিং অ্যান্ড ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) সিম্ফোনি মোবাইল, এডিসন গ্রুপ ‘একটা জিনিসের পরিচিত তুলে ধরা হয় ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে, ইতিবাচক আর নেতিবাচক, দুরকমই হতে পারে এটা। একটা সময় আমরা ব্র্যান্ডের সমাদর করতাম, কিন্তু সেভাবে কর্মক্ষেত্রে মূল্যায়ন করতাম না। এখন আর সেইদিন নেই, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানই ব্র্যান্ডিংয়ের উপর দিয়েছে বিশেষ নজর’, দ্রুত অগ্রসরমান মোবাইল নির্মাতা সিম্ফোনির সিনিয়র ম্যানেজার মার্কেটিং অ্যান্ড ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট জাহিদুল ইসলাম বললেন এসব কথা। চট্টগ্রামের ছেলে জাহিদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে সেখানেই। স্থানীয় স্কুল-কলেজ থেকে এসএসসি-এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। স্নাতক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করেন তিনি। আর তার পরেই জাহিদ যোগ দেন একটি অ্যাড ফার্মে। তিনি মনে করেন, মার্কেটিং তথা ব্র্যান্ডিংয়ের মূলবিষয়গুলো অ্যাডফার্মগুলো পর্যবেক্ষণ করে থাকে। কাজেই এখানে শেখার সুযোগটা থাকে অনেক বেশি। এরপর ২০০৭ সালে তিনি যোগ দেন আরএকে পেইন্টসে। মাঝে কিছুদিন একটা জাতীয় দৈনিকেও কাজ করেন। অবশেষে গেল বছর জুনে যোগ দেন সিম্ফোনিতে। নিত্যনতুন ভাবনার আলোকে গ্রাহককে সর্বশেষ তথ্যটা পৌঁছে দেওয়াই তাদের কাজ। আর জাহিদ একঘেয়ে কাজে কখনোই আগ্রহী ছিলেন না বলেই আগ্রহ নিয়ে কাজ করছেন এখানে। জাহিদ মনে করেন, ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্টে কাজ করতে গেলে বেশকিছু চ্যালেঞ্জিং দিকও মোকাবেলা করতে হয়। গ্রাহকের সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সহজ মাধ্যম হচ্ছে ব্র্যান্ডিং। কাজেই কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটা মোকাবেলা করতে হবে। ব্র্যান্ডিংয়ে কাজ করতে চান, এমন তরুণদের উদ্দেশ্যে জাহিদ বলেন, ‘কিছুদিন অবশ্যই অ্যাডফার্মে কাজ করে নেওয়া দরকার। কারণ এখানে সরাসরি অনেক ব্র্যান্ডের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। কাজের অনেক অভিজ্ঞতা তো হয়ই, একই সাথে নিজের পরিচিতিও বাড়ে।’ জাহিদ নতুনদের কাজের প্রতি অনেক আগ্রহ উল্লেখ করে বলেন, ‘ব্র্যান্ডিংয়ের কাজের জন্য তরুণরাই সবচেয়ে বেশি উদ্যমী। তারা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। আর আমাদের দেশে যেভাবে এই পেশার মূল্যায়ন হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে অনেকেই ব্র্যান্ড কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারবে স্বাধীনভাবে ’ প্রজন্মের এই ব্র্যান্ড কনসালটেন্ট মনে করেন, সফলতার কোনো সংজ্ঞা নেই। একধাপ পার করেই আমরা পরের ধাপে অগ্রসর হই, এভাবেই তো জীবন এগিয়ে চলে। আর সে যাত্রায় জাহিদ এগিয়ে যাবেন অনেকদূর। জাহিদুল ইসলাম ডাকনাম :জাহিদ জন্ম তারিখ ও স্থান :২৯ এপ্রিল, চট্টগ্রাম মায়ের নাম :রোকেয়া বেগম বাবার নাম :মরহুম এসএম নূরুল ইসলাম প্রথম স্কুল :হালিশহর হাউজিং সোসাইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :আমার মামা প্রিয় উক্তি :কোনো কিছুই সহজে আসে না, চেষ্টা করে যাও। প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :ইন্টারনেটে, মুভি দেখে সাফল্যের সংজ্ঞা :কাঙ্ক্ষিত জায়গাতে পৌঁছানো। === বাপ্পা সরকার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, প্রোডাক্ট অ্যান্ড ব্র্যান্ড অ্যানালাইসিস্ট, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লি. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন মাত্র। পরিচিত কোনো একজন বলে বসলেন, ‘ফার্মাসিতে পড়ে কী হবে? বড়জোর একটা ওষুধের দোকান দিতে পারবে।’ কিন্তু বাপ্পা সরকার পাস করেই প্রথম চাকরি পেয়ে যান বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেডের মার্কেটিংয়ে। মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয়টাও তাদেরকেই দেখতে হয় বলে জানালেন তিনি। বাপ্পা সরকার বলেন, ‘চিকিত্সা ও ওষুধ সম্পর্কিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলমান গবেষণা ও ফলাফলের ভিত্তিতে সর্বাধুনিক তথ্য-উপাত্ত চিকিত্সকের কাছে পৌঁছে দিয়ে রোগীর সর্বোত্তম চিকিত্সা নিশ্চিত করাই এই বিভাগের অন্যতম একটি দিক। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওষুধের গুণগত ব্র্যান্ডিং।’ ব্র্র্যান্ড ম্যানেজমেন্টে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বাপ্পা বলেন, ‘ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল শুরু থেকেই। নিজের ব্র্যান্ডকে, নিজের কাজকে একটু আলাদাভাবে উপস্থাপন করার অফুরন্ত সুযোগও রয়েছে এখানে। প্রতিযোগিতার এ বাজারে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হলে যে বিষয়টিকে সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি তা হলো ‘আইডিয়া’। আর ব্র্যান্ডিং বিষয়টা শুধুমাত্র ছকে বাঁধা অফিসের সময়টুকুতে সীমাবদ্ধ নয়, যা এর বাইরেরও অনেক কিছু, অনেকটা সাধনার মতো।’ বাপ্পা জানান, আত্মবিশ্বাসটা এ পেশায় অনেক বেশি জরুরি। দরকার নতুন কিছু চিন্তা করার স্বাধীনতা, সঙ্গে অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ একটা কাজের পরিবেশ; যার সবটুকুই তিনি পেয়েছেন তার এই প্রতিষ্ঠানে। নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সমস্ত কাজের সার্থকতা থাকে তখনই যখন আমার আইডিয়া, আমার ব্র্যান্ড আমার গ্রাহকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায়, ঠিক যেভাবে আমি চাচ্ছিলাম। এ পেশায় ভালো করতে কিছু গুণ থাকা জরুরি। কথায় ও কাজে মিল থাকা, বলার চেয়ে শোনার প্রবণতা বেশি থাকা, অ্যানালাইটিক্যাল হওয়া, অনেক বেশি কমিউনিকেটিভ হওয়া চাই। সৃজনশীল চিন্তা ও কাজের মাধ্যমে খুব দ্রুত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এ পেশায়।’ বাপ্পার ছোটবেলা কেটেছে মানিকগঞ্জের ঘিওরে। এসএসসি শেষ করেই ঢাকায় চলে আসেন। মা, বাবা ও ছোট বোনকে নিয়েই তার পারিবারিক আবহ। বাবা ব্যবসা করেন আর মা গৃহিণী। এ পেশাতেই নিজেকে আরও এগিয়ে নিতে চান বাপ্পা সরকার। বাপ্পা সরকার ডাকনাম :রনি জন্ম তারিখ ও স্থান :১ জুন, মানিকগঞ্জ মায়ের নাম :শেফালী সরকার বাবার নাম :বাবুল সরকার প্রথম স্কুল :ঘিওর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, ছবি তুলে সাফল্যের সংজ্ঞা :সঠিক পরিকল্পনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন।