বাবা ছিলেন চিত্রশিল্পী। কিন্তু কলকাতা আর্ট স্কুলের ছবি আঁকার পাঠ শেষ করতে না পারায় একটা বেদনা ছিল তার মনে। এ কারণেই হয়ত মনের অজান্তেই তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর ছেলে-মেয়েদের কেউ একজন শিল্পী হোক। তাই হয়ত সচেতনভাবেই এক সন্তানের নামও রেখেছিলেন মহাকবি কালিদাসের নামে, যে মাত্র ৩ বছর বয়সেই মারা গিয়েছিল। আর ছোট ছেলের মাঝে কাব্যগুণের প্রকাশ দেখে, শিল্পী হতে সহায়তা করতে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার বিশাল আকাশে। যে আকাশকে ক্যানভাস করে তাঁর ছেলে আঁকবে কাব্যচিত্র। তাঁর সেই স্বাধীনতার আকাশ পাওয়া ছেলেটির নাম নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা ‘নতুন কাণ্ডারী’। এ সময় এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রবীণ সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী। কবিতাটি ছিল নেত্রকোনার নবাগত এস.ডি.ও. নূরুল ইসলাম খানকে উদ্দেশ্য করে লেখা। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর আই.এস.সি. পড়তে চলে আসি ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। থাকতাম হিন্দু হোস্টেলে। নতুন জীবনের স্বাদ পেলাম এখানে। হোস্টেলে দেরি করে ফেরা ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। ২য় বর্ষে উঠেই হোস্টেলের ম্যানেজার নির্বাচিত হই এবং বাজারের টাকা মারা ও জুয়া খেলার অপরাধে হোস্টেল ত্যাগের নির্দেশ পাই। সকলের বক্র দৃষ্টি আমাকে কণ্টকবিদ্ধ করতে থাকে। আনন্দমোহনে আর আনন্দ খুঁজে পাওয়া হল না। বিদ্রূপ এসে নাও ভিড়িয়েছে সেখানে। বাবার প্রস্তাবে টিসি নিয়ে চলে যাই নেত্রকোনা কলেজে। যে কলেজটি আই.এস.সি. দ্বিতীয় বর্ষে আমাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এখানে আমি ভর্তি হই বিএসসি পাস কোর্সে। যদিও এ পরীক্ষায় আমার উত্তীর্ণ হওয়া হয়নি। ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বি.এ. পাস করি। যদিও সেই বি.এ. সার্টিফিকেটটিও আমার তোলা হয়নি।
এরকম অনেক ঘটনা ঘটিয়ে একসময় চলে আসি ঢাকায়। থাকতে শুরু করি নাট্যকার বন্ধু মামুনুর রশীদের সাথে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের হোস্টেলে। কাজ শুরু করি আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকায়। এ সময় কবি বন্ধু আবুল হাসান আমার সর্বক্ষণ সঙ্গী হয়ে ওঠেন। এ সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হই। দেশ তখন অস্থির। ৬ দফা আন্দোলন তখন দানা বাঁধছে। তখন ‘সংবাদ’ এ ছাপা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে উত্সর্গ করা আমার কবিতা ‘প্রচ্ছদের জন্য’। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সহপাঠী হিসাবে পাই মুজিব কন্যা শেখ হাসিনাকে। এ সময় ১৯৬৭ সালে কবি শামসুর রাহমান, কবি আল মাহমুদ, কবি সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ঢাকা শহরে আমার নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা ছিল না। কবিতা লিখতাম, ঘুরে বেড়াতাম, আড্ডা দিতাম, প্রকাশকদের বইয়ের প্রুফ দেখে দিতাম। আর টাকা পেলে নিয়মিত যেতাম ঠাঁটারিবাজারের হাক্কার জুয়ার আড্ডায়। ১৯৬৮ সালের ২৯ জুলাই হোটেল পূর্বাণীতে তরুণ কবিদের কবিতা পাঠের আসরে আমি সুযোগ পাই। পত্রিকা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার পায় এ কবিতা পাঠের আসর। এ সুযোগ আমাকে পাঠক ও কবি মহলে পরিচিতি দেয়। (অনুলিখিত)
