রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নৈরাজ্যমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। এদের ক্ষমতার কাছে স্থানীয় প্রশাসন কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলাটি শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি এবং এলাকায় ঠিকাদারি কাজ পাওয়া নিয়ে অনেক দিন ধরেই স্থানীয় কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এলাকায় এরাই নাশকতাসহ নানা অপতত্পরতা চালায়। এরা রাজনৈতিকভাবে খুবই ক্ষমতাধর। এদের প্রত্যেকের পরিবারেই কমবেশি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য রয়েছেন। তাই প্রশাসনকে দলীয়ভাবে ব্যবহার করতে এদের অসুবিধা হয় না। আবার সরকার পরিবর্তন হলেও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা এদের থেকেই যায়। শুধু ছোট ভাই থেকে বড় ভাই কিংবা বড় ভাই থেকে ছোট ভাইয়ের কাছে স্থানান্তর হয়। এমন অবস্থা গত এক যুগ ধরে চলে আসছে।
সম্প্রতি বিরোধী দলের কর্মসূচি চলাকালে সীতাকুণ্ডে যানবাহন, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তিন স্তরের অনুসন্ধান চালিয়ে পরিবার কেন্দ্রিক ক্ষমতার হাত বদলের এই তথ্য জানা গেছে। এদিকে গত শনিবার মধ্য রাত থেকে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সীতাকুণ্ডে কম্বিং অপারেশন শুরু করেছে। নাশকতায় জড়িত অভিযোগে গতকাল রবিবার ছাত্রলীগ নেতাসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, সীতাকুণ্ড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে অভিযান চলছে। জড়িত যেই হোক, ছাড় দেয়া হবে না বলে আইজিপি জানান।
র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, সীতাকুণ্ডে রাজনৈতিক সহিংসতা, নাশকতাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় ছিন্নমূল বস্তিতে বসবাসকারী একটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে এসব কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, নাশকতা কার্যক্রম চালিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে একটি মহল। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শনে নাশকতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার হাফিজ আকতার বলেছেন, সীতাকুণ্ডে প্রায় ৮শ’ পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি অভিযান শুরু করেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জামায়াত নেতার বাসায় প্রধানমন্ত্রীর ছবি !
এদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গত ২৪ ঘন্টায় উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে এক ছাত্রলীগ নেতাও রয়েছেন। জানা গেছে, শনিবার গভীর রাতে পুলিশ সীতাকুণ্ড পৌর জামায়াতের আমীর তোহিদুল হক চৌধুরীকে গ্রেফতার করতে তার বাসায় যায়। এ সময় তারা কক্ষে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি টানানো দেখতে পায়। পরে তোহিদুলকে না পেয়ে তার ছোট ভাই পৌরসভা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক তরিকুল হক চৌধুরীকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। এছাড়া পুলিশ বড়বাড়ি নুনাবিল বাঁশবাড়িয়া অর্জুর মিয়ার পুত্র নুর আলম (৩৭), উত্তর ঘোড়ামারা মৃত আলি আহমদের পুত্র শফিউল আলম (৪৪), পেশকারপাড়ার তাজুল ইসলামের পুত্র মোহাম্মদ মিলন হোসেন (২৫) ও সবুজকে (২০) গ্রেফতার করেছে।
‘নাশকতাকারী যত বড় নেতা হোক, রেহাই পাবে না’
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, গতকাল রবিবার উপজেলা পরিষদে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলেছেন, নাশকতাকারী যত বড় নেতা হোক না কেন তারা রেহাই পাবে না। তারা বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নাশকতা রোধে শিগগিরই চিরুনি অপারেশন শুরু করা হবে। সীতাকুণ্ডের ৫৩ কিলোমিটার মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার প্রয়োজনে ৫৩ হাজার আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করবে।
উপজেলার সকল জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতাদের নিয়ে এই মতবিনিময় সভা করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন বিজিবির রিজিওনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহম্মদ আলী, ডিআইজি নওশের আলী, এডিশনাল ডিআইজি মোশারফ হোসেন, জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান, চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার হাফিজ আক্তার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহম্মদ শাহীন ইমরানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা।
এদিকে নাশকতা বন্ধে গতকাল উপজেলার ছলিমপুরে স্থানীয় যুবলীগ মিছিল-সমাবেশ করেছে। জামায়াতের মুক্তাঞ্চল খ্যাত বাড়বকুন্ড এলাকায় গ্রামবাসীদের নিয়ে প্রশাসনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
