মাতৃত্ব বনাম পেশাদারিত্ব

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৩, ১৭:৩৫
সন্তানকে বাসায় রেখে অফিস করছেন আপনি। অফিসে কাজের চাপও থাকে অনেক। তার ওপর লম্বা সময় ধরে মিটিং চলছে বিকালে। এত কাজের মাঝে সারাদিনে মাত্র একবার ফোন করতে পেরেছেন আপনার সন্তানটিকে। আপনার সন্তান আজ আপনাকে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে বলেছে আর আজই অফিসে মিটিংয়ের কারণে দেরি হলো। মনটা হঠাত্ করেই খুব খারাপ হয়ে যায়। এমনই সমস্যায় মাঝে মাঝে মাতৃত্ব ও পেশার মধ্যে শুরু হয় টানাপোড়েন। এ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেই চিন্তা করতে হয় সকালে অফিস যাওয়ার আগে কী রান্না করা হবে, সন্তানদের কী খেতে দিতে হবে ইত্যাদি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিঃশ্বাস ফেলারও সময় থাকে না। এরপর অফিসে কাজের চাপ, অফিসের জটিলতা, ক্যারিয়ার—এসব তো আছেই, যা একজন কর্মজীবী নারীকে উদ্বিগ্ন করে রাখে। শত ব্যস্ততা ও উদ্বিগ্নতার মধ্যেও দেখা দেয় চিন্তা, ‘বাড়িতে যাকে রেখে এলাম সে ভালো আছে তো? কী করছে এখন বাবুটা?’ এদিকে বাড়িতে থাকা মানুষটাও কী কম চিন্তায় থাকে? কম্পিউটার, টিভি, গেমস্ কতক্ষণ ভুলিয়ে রাখতে পারে তাকে? প্রতিটি কলিংবেল বা দরজায় টোকা, পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে সে, ‘এই বুঝি মা এল!’ বহুপ্রতীক্ষার পর যখন মা আসে যেন সবকিছু হাতের মুঠোয়, কী ভীষণ শক্তি আর সাহস জাগে, বেড়ে যায় দুষ্টুমিও। সারাদিন অফিসের নানান ঝামেলায় ক্লান্ত শরীরে সন্তানের দুষ্টুমি আর আবদার বিষম লাগে কখনও কখনও এবং তখনই বাঁধে বিপত্তি। এদিকে মাকে কাছে পাওয়ার আকুলতা এবং নিজের মতো করে কাছে না পাওয়াটা সন্তানের মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে, যেটি দিন দিন মা ও সন্তানের মাঝে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তটা নিতে হবে নিজেকেই। এ ক্ষেত্রে আসলে নিজের বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। তবু এ সমস্যা সামলে নিতে কী করা যেতে পারে, আসুন জেনে নিই।  শুরু থেকেই কর্মক্ষেত্রকে একটি পরিবার মনে করতে হবে। সহকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। নিজের সমস্যার কথা জানিয়ে মিটিংয়ের প্রস্তুতি তাদের নিতে বলতে পারেন। যেন অফিসে এসেই আপনি সরাসরি আপনার প্রেজেন্টেশন শুরু করতে পারেন। এতে সময় বাঁচবে। মিটিং শেষ হওয়া মাত্র দেরি না করে বাড়ি যেতে পারবেন। আর একান্তই মিটিংয়ে হাজির হতে না পারলেও তারা যেন দায়িত্ব নিয়ে অফিসের দিকটা সামলে নিতে পারেন, সেজন্য তাদের আগেই টেলিফোনে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলা যেতে পারে।  চাকরিজীবী মায়েদের আগে থেকেই এ ধরনের সমস্যার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে ফেলতে হবে।  পরিবারের দিক থেকে সবার আগে দায়িত্ব নিতে হবে সন্তানের বাবাকে। স্ত্রীকে যদি অফিসে যেতেই হয়, স্বামী যেন ব্যাপারটা বোঝেন এবং বাসার দিকটা সামলে নিতে পারেন।  কাজের লোকের কাছে রেখে আসতে ভরসা না পেলে কাছের কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে অনুরোধ করতে পারেন আপনার অনুপস্থিতিতে বাসায় থাকার জন্য। নিজের ব্যস্ততার জন্য সন্তানের সাথে একটি সূক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি হয়ে যেতে পারে। সন্তানের সাথে এই দূরত্ব কমানোর জন্য মা’কেই প্রধান ভূমিকাগুলো নিতে হবে। নিচে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো—  মাঝে মাঝে আপনার সন্তানকে অফিসে নিয়ে যান। তাকে পুরো অফিসটা ঘুরিয়ে দেখান। অফিসের কলিগদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তাকে বুঝান আপনার অফিসেও তার গুরুত্ব অনেক। এতে আপনার সন্তান খুশি হবে এবং এর রেশ তার মনে অনেকদিন থাকবে।  ছুটির দিনগুলো সম্পূর্ণ সন্তানকে দিন। পরিবারের সবাই মিলে ছুটির দিনে ঘুরতে বের হন। বাইরে খেতে পারেন আর যদি বের হওয়া সম্ভব না হয় তবে সন্তানের পছন্দসই মজার খাবার তৈরি করুন, তার গল্প শুনুন, তার সাথে খেলা করুন।  আপনার সন্তানকে দেখাশোনার জন্য যাকে রেখেছেন কখনোই তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করবেন না। সন্তানের সামনে তো না-ই। তাকে আপনার সন্তানের সবচেয়ে ভাল বন্ধু বানাতে সাহায্য করুন।  অফিস থেকে আসতে যদি কোনো কারণে দেরি হয়ে থাকে তবে তাকে আগেভাগেই জানান। পারলে সম্ভাব্য সময় বলে দিন এবং কী কারণে দেরি হচ্ছে তাও তাকে জানানো উচিত।  কোনো কোনো দিন ইচ্ছাকৃত ছুটি নিন। সেদিন তাকেও বলেন স্কুলে যেতে হবে না। সারাদিন আমরা গল্প করব। দেখবেন অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটিতে আপনি তার কত ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন।  সন্তানের শিক্ষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। সশরীরে না পারলেও স্কুলের শিক্ষকদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করুন। যাদের বাসায় কিশোর বা কিশোরী আছে সেইসব কর্মজীবী মায়েদের সন্তানের সাথে আচরণে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এই বয়সে শারীরীক ও মানষিক পরিবর্তনের কারণে তার আচার আচরণও বদলে যায়। যে সন্তান কখনও মাথা তুলে দাঁড়ায় না, সেও মুখে মুখে তর্ক করে। অধিকাংশ কিশোর বা কিশোরীদের একটাই অভিযোগ, ‘মা আমাকে বোঝার চেষ্টা করে না। শুধু শাসনই করে।’ তাই তাদের পরিবর্তনগুলো বোঝার চেষ্টা করেন। তাকে আশ্বস্ত করেন আপনি তার সবচেয়ে ভালো ও বিশ্বস্ত বন্ধু। বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে টিকে থাকতে মাকে তার সন্তান রেখে যেতে হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে। অনেক বাধা-বিপত্তি পার করে মা যখন সন্তানকে সাফল্যের চূড়ায় দেখতে পায় তখন সেই মা ধন্য। মডেল তানি ও অহনা ছবি দীপঙ্কর দীপু