আসছে বর্ষাকাল। ঝুঁকি বাড়তে শুরু করেছে নৌপথে। বর্ষা মৌসুম এলেই নদীবেষ্টিত দক্ষিণাঞ্চলে নৌদুর্ঘটনায় যাত্রীদের প্রাণহানি ঘটে। অথচ বিশাল নৌপথ সুরক্ষায় আজও কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে অন্যতম বাহন নৌযান। বিশেষ করে বেসরকারি লঞ্চগুলোই সিংহভাগ যাত্রী পরিবহন করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো প্রকার মনিটরিং ছাড়াই বিভিন্ন রুটে এসব নৌযান বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। মেঘনার ডেঞ্জার জোন থেকে শুরু করে ঢাকা-বরিশাল রুটের দোতলা বা তিন তলা লঞ্চ থেকে শুরু করে এমএল টাইপে’র ছোট্ট লঞ্চ এমনকি ট্রলার (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) গুলোও কোন নিয়ম-নীতি না মেনে ইচ্ছেমাফিক যাত্রী পরিবহন করে থাকে। প্রায় বছরই বর্ষা মৌসুমে ও ঈদ-কোরবানীতে দক্ষিণাঞ্চলে নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নানা তত্পরতা শুরু করলেও পরে সবকিছু থমকে দাঁড়ায়।
নৌযান মালিকরা তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী নৌযান পরিচালনা করতে থাকেন। ১৫ মার্চের পর মেঘনার ডেঞ্জার জোনে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে। আর মাত্র সপ্তাহখানেক পরই দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী উত্তাল হয়ে উঠবে। কিন্ু্ত দৌলতখান-আলেকজান্ডার, মনপুরা-হাতিয়া, বেতুয়া-তজুমদ্দিন-হাকিমউদ্দিন ও গলাচিপা-রাঙ্গাবালিসহ ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলোতে ট্রলার বা একতলা লঞ্চের পরিবর্তে বর্ষাকালীন নৌযান যুক্ত করার কোন উদ্যোগ নেই। বর্ষা মৌসুমে এসব রুটে বিআইডব্লিউটিসি’র সি-ট্রাক-এর বাইরে ছোট্ট সাইজের নৌযান চলাচলের নিয়ম নেই। বর্ষাকাল আসন্ন হলেও অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধের জন্য বিআইডব্লিউটিএ জোড়ালো কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এখানকার বন্দর কর্মকর্তা জানান, মৌসুমের শুরুতেই অবৈধ নৌযান বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে বিআইডব্লিউটিসি এসব রুটে প্রয়োজনীয় সি-ট্রাক দিতে না পারলে যাত্রী দুর্ভোগ বেড়ে যায়। তখন অবৈধ নৌযান চলাচল ঠেকানো মুশকিল হয়ে পড়ে। ফিটনেসবিহীন নৌযানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর জন্য সব সময়ে চাহিদা অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্টেট ও পুলিশ প্রশাসনের জনবল পাওয়া যায় না। যে কারণে প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তবে আগামী ১৫ মার্চের পর মেঘনার ডেঞ্জার জোনসহ ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলোতে অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে পত্র দেয়া হবে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে ঢাকা-বরিশাল রুটে রোটেশন পদ্ধতিতে চলাচল করছে দোতলা লঞ্চগুলো। ঢাকা ও বরিশাল উভয় প্রান্ত থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র রুট পারমিট অনুযায়ী প্রতিদিন ৬ থেকে ৭টি করে লঞ্চ ছাড়ার কথা রয়েছে। কিন্ু্ত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যাত্রীদের জিম্মি করে উভয় প্রান্ত থেকে ৩টি করে লঞ্চ পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে যাত্রী দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। শুধু ঢাকা-বরিশাল রুট নয়। রাজধানী ঢাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ৩৮টি রুটে একইভাবে রোটেশন পদ্ধতিতে লঞ্চ পরিচালনা করে যাত্রীদের জিম্মি করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে যে সব লঞ্চ চলছে তা খুবই নাজুক। বর্ষাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রীদের উঠতে বাধ্য করা হয়। দক্ষ মাষ্টার, সুকানী ও ড্রাইভার ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে এ অঞ্চলের নৌপথে দীর্ঘদিন লঞ্চ চলাচল করছে। বিআইডব্লিউটিএ’র হিসাব মতে, দক্ষিণাঞ্চলে নৌ রুট ৮৮টি। এর মধ্যে ঢাকার সাথে সরাসরি নৌযান চলাচল করে ৩৮টি রুটে। বাকী অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে চলে ‘এমএল টাইপে’র একতলা ছোট লঞ্চ। সরকারি হিসাব মতে, প্রতিদিন নৌ-পথে এ অঞ্চল থেকে যাতায়াত করে লক্ষাধিক যাত্রী। দেশের নৌযানের এখন পর্যন্ত সঠিক কোন হিসাব নির্ধারণ না হলেও রুট পারমিট অনুযায়ী এসব রুটে ১১৬টি লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট রয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়। সেখানেও ট্যাক্স ফাঁকির জন্য যাত্রী পরিবহন কম দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশের সর্ববৃহত্ যাত্রীবাহী জলযান হিসাবে পরিচিত ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী সুন্দরবন-৭ লঞ্চে বয়া আছে মাত্র ১৫৩টি। যাত্রী ধারণ ক্ষমতা সরকারি হিসেবে ৯৯০ জন। কিন্তু কখনই সহস্রাধিক যাত্রীর নিচে ঐ লঞ্চটি গন্তব্যে রওয়ানা হয় না। সুরভী-৭ লঞ্চে বয়া আছে ১০৭টি। যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ১২৫০ জন। সুরভী-৬ লঞ্চে যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৮৯০ জন। বয়া আছে ১২৫টি। কীর্তনখোলা-১ লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা ৭১৫ জন। বয়া আছে ১শ’টি। নিয়ম অনুযায়ী ৪ জন যাত্রীর জন্য একটি করে বয়া থাকার কথা। কাগজে-কলমের হিসেবে সবকিছু ঠিক থাকলেও বাস্তবে নেই।
বিলাসবহুল লঞ্চগুলোর যখন এ অবস্থা তখন পারাবাত, দ্বীপরাজ ও কালাম খানসহ অপর লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের উঠতে হয় একমাত্র আল্লাহতা’আলার উপর ভরসা করে। নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করেই ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চগুলোর মত এমএল টাইপের একতলা লঞ্চগুলো চলাচল করছে এ অঞ্চলে বড় বড় নদীতে। অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী শতাধিক লঞ্চের মধ্যে প্রায় অর্ধেক লঞ্চেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাষ্টার-ড্রাইভার নেই। লঞ্চগুলো চালায় খালাসি ও হেলপাররা। ফিটনেস নেয়ার সময় অভিজ্ঞ চালক ও মাষ্টারদের সনদ দেখিয়ে রুট পারমিট নেয়া হয়। পরবর্তীতে খালাসি ও হেলপাররা লঞ্চ পরিচালনা করায় ঘটে দুর্ঘটনা।
