নাটক, রোমাঞ্চ, উত্তেজনা, স্নায়ুচাপ; অনেক বিশেষণ যোগ করা যেতে পারে তবে কিছুর দরকার নেই। একটা কথা বলে দিলেই হল—আরেকটি ক্ল্যাসিক ভারত-পাকিস্তান লড়াই দেখলো মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়াম। আর চিরকালের মতো পরতে পরতে উত্তেজনায় ঠাসা এই ম্যাচে শেষ হাসিটা হাসলো পাকিস্তান। বলা ভালো প্রায় অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠা এক জয় পাকিস্তানকে এনে দিলেন শহীদ খান আফ্রিদি।
আগে ব্যাট করে ভারত করেছিল ২৪৫ রান। আর নাটকীয় মোড় নিতে থাকা ম্যাচের শেষ পর্যন্ত মাত্র ২ বল বাকী থাকতে ১ উইকেটের এক জয় এনে দিলেন আফ্রিদি। এই ম্যাচ জয়ের ফলে ফাইনালে পা রাখা অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেললো পাকিস্তান।
একটা সময় ছিল, যখন এই ঢাকায় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হলে থেমে যেত শহরের জীবনযাত্রা।
উত্তেজনাটা গতকালও ছিল। কিন্তু সেই উপচে পড়া ভিড়, শহরজুড়ে কোলাহল আর নেই। বরং গ্যালারির একটা বড় অংশ ফাঁকাই পড়ে রইল। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের এক কর্মকর্তা গ্যালারির অবস্থা দেখে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন—বাংলাদেশ খারাপ করেছে বলে মানুষ এশিয়া কাপের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে!
মানুষ আগ্রহ হারালেও ভারত-পাকিস্তান মাঠের লড়াইয়ে উত্তেজনার অভাব ছিল না। সেই উত্তেজনাটা জমলো আসলে শেষ ওভারগুলোতে এসে।
ভারতের ছুঁড়ে দেয়া ২৪৬ রানের লক্ষ্যে বেশ সাবলীলভাবে চলছিল পাকিস্তান। ৪৩.২ ওভারে ৪ উইকেটে ২০০ রান তুলে ফেলেছিল তারা। এখান থেকেই ৩ রানের ব্যবধানে দুই সেট ব্যাটসম্যান হাফিজ ৭৫ রান করে এবং মাকসুদ ৩৮ রান করে ফিরে যান। এরপরই শুরু হয় ভারতীয় বোলারদের চেপে বসা। রান-বলের সমীকরণটা আস্তে আস্তে কঠিন হতে থাকে।
শেষ ৫ ওভারে পাকিস্তানের দরকার ছিল ৪৩ রান। এই সময়ে ‘বুম বুম’ আফ্রিদি এসে জাদেজার এক ওভারে ১৩ রান তুলে নিয়ে আবার সমীকরণটা নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসেন। পরের ওভারে উমর গুলের সঙ্গে মিলে আবারও নেন ১৩ রান। ফলে শেষ ১৮ বলে দরকার ছিল মাত্র ১৭ রানের। কিন্তু ৪৮ ও ৪৯তম ওভার মিলিয়ে পাকিস্তান ২টি উইকেট হারিয়ে তুলতে পারে মাত্র ৭ রান; আফ্রিদি স্ট্রাইকই পাচ্ছিলেন না।
শেষ ওভারে দরকার তখন ১০ রান। প্রথম বলেই আউট সাঈদ আজমল। শেষ ৫ বলে চাই ১০ রান; হাতে ১ উইকেট। জুনায়েদ খান কোনোক্রমে একটা সিঙ্গেল নিলেন। ব্যাস! বাকী দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন সেই আফ্রিদি। অশ্বিনকে পরপর দুটি ছক্কা মেরে সব উত্তেজনায় ঢেলে দিলেন পানি; পাকিস্তান পেল ১ উইকেটের জয়। আর আফ্রিদি ১৮ বলে ৩৪ রানের ইনিংস খেলে নায়ক হয়ে রইলেন।
এর আগে টসে জিতে ভারতকে আগে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিল পাকিস্তান। একপ্রান্তে রোহিত শর্মা ফর্মখরা কাটিয়ে রানে ফিরলেও অন্যপ্রান্তে বেশ ভালো বিপদ নিয়ে শুরু করে ভারত। শিখর ধাওয়ান দ্রুত আউট হয়ে ফেরার পর ভারতের সেরা বাজি বিরাট কোহলিও স্বভাববিরুদ্ধ ইনিংস খেলে ফেলেন। এরপর রাহানে রোহিতকে কিছুটা সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। রোহিত ৫৬ ও রাহানে ২৩ রান করে আউট হয়ে ফেরার পর আম্বাতি রাইডু ও দিনেশ কার্তিক। এর মধ্যে রাইডু ফিফটি করেই ফেরেন। তবে ভারতকে আসল কাজটা করে দেন রবীন্দ্র জাদেজা। ৪৯ বলে ৪টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজানো ৫২ রান করে ভারতের স্থবির হওয়া রানের চাকাকে ঘুরিয়ে মোটামুটি লড়াকু একটা পুঁজি এনে দেন তিনিই।
শেষ দিকে পরপর তিনটি উইকেট নিয়ে সাঈদ আজমল সেরা বোলার হলেও পাকিস্তানের সেরা আকর্ষণ ছিলেন এই ম্যাচেই অভিষিক্ত পেসার তালহা। তিনি নিয়েছেন ২ উইকেট।
পাকিস্তান-ভারত
ভারত
রান বল ৪ ৬
রোহিত ক হাফিজ ব তালহা ৫৬ ৫৮ ৭ ২
ধাওয়ান এলবিডব্লু হাফিজ ১০ ১৩ ২ ০
কোহলি ক আকমল ব গুল ৫ ১১ ০ ০
রাহানে ক হাফিজ ব তালহা ২৩ ৫০ ৩ ০
রাইডু ক আনোয়ার ব আজমল ৫৮ ৬২ ৪ ১
কার্তিক ক আজমল ব হাফিজ ২৩ ৪৬ ১ ০
জাদেজা নটআউট ৫২ ৪৯ ৪ ২
অশ্বিন স্ট্যা আকমল ব আজমল ৯ ৭ ২ ০
শামি ক মাকসুদ ব আজমল ০ ৩ ০ ০
মিশ্র নটআউট ১ ১ ০ ০
অতিরিক্ত (বা ৩, ও ৫) ৮
মোট ৫০ ওভারে ২৪৫/৮
বোলিং:
হাফিজ ৯-০-৩৮-২, গুল ৯-০-৬০-১, জুনায়েদ ৭-০-৪৪-০, আফ্রিদি ৮-০-৩৮-০, তালহা ৭-১-২২-২, আজমল ১০-০-৪০-৩
পাকিস্তান
সার্জিল ব অশ্বিন ২৫ ৩০ ৩ ১
শেহজাদ ক অশ্বিন ব মিশ্র ৪২ ৪৪ ৬ ০
হাফিজ ক বিনয় ব অশ্বিন ৭৫ ১১৭ ৩ ২
মিসবাহ রানআউট ১ ৪ ০ ০
আকমল ক জাদেজা ব মিশ্র ৪ ১৭ ০ ০
মাকসুদ রানআউট ৩৮ ৫৩ ২ ১
আফ্রিদি নটআউট ৩৪ ১৮ ২ ৩
গুল ক রাহানে ব বিনয় ১২ ১২ ০ ১
তালহা ক জাদেজা ব বিনয় ০ ১ ০ ০
আজমল ব অশ্বিন ০ ১ ০ ০
জুনায়েদ নটআউট ১ ১ ০ ০
অতিরিক্ত (বা ১১, ও ৬)
মোট ৪৯.৪ ওভারে ২৪৯/৯
বোলিং:
বিনয় ১০-০-৫৬-২, শামি ১০-০-৪৯-০, অশ্বিন ৯.৪-০-৪৪-৩, জাদেজা ১০-১-৬১-০, মিশ্র ১০-০-২৮-২
ফল: পাকিস্তান ১ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মোহাম্মদ হাফিজ
