যন্ত্রেরও বিশ্রাম আছে...

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৪
এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁর দুটি সন্তান। একটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে অন্যটি ছোট। জানা গেলো জেলা শহর থেকে তাঁর বাড়ি প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে। মূলত তিনি কৃষক পাশাপাশি ব্যবসা করেন। শহরে থাকেন সন্তানদের মানুষ করার জন্য। শহরের একটি জনপ্রিয় বেসরকারি স্কুলে পড়ে তাঁর ছেলে। লোকটি খুব চিন্তিত ছেলেকে নিয়ে। অন্যান্য বিষয়ে আটানব্বই, নিরানব্বই কখনো এক শ নম্বর পেলেও, ইংরেজিতে পঁচানব্বই নম্বরের বেশি পায় না। শিশুটির ক্লাস রোল পঁয়ত্রিশ। কথা প্রসঙ্গে বললেন, ছেলেটার পিছনে যত টাকা খরচ করছি সেই টাকা ব্যাংকে রাখলে এর মুনাফাটাই সে জীবনে খেয়ে শেষ করতে পারবে না। কত টাকা তিনি খরচ করেছেন দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সন্তানের পিছনে? অনুমান করে বললেন, প্রতিমাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা। দুঃখ করে বললেন, তারপরও যদি ছেলের ক্লাস রোল পঁয়ত্রিশ হয় তাহলে কার না কষ্ট লাগে। তাহলে এত টাকা খরচ করছেন কেন? ব্যাংকে জমা রাখেন। উত্তরে বললেন, যেভাবেই হোক ছেলেকে মানুষ করতে হবে। প্রয়োজনে ইংরেজি বিষয়ের জন্য আলাদাভাবে দক্ষ একজন শিক্ষক রাখবো। কথায় কথায় আরো বললেন, খুব সকালে তাকে ঘুম থেকে তুলতে হয়। তারপর সারাদিন ওর মা, আমি, প্রাইভেট, কোচিং ও স্কুলের শিক্ষক পড়াশোনার জন্য তার পিছনে লেগে থাকি। রাতের ঘুমটুকুই তার একমাত্র অবসর। টিভি দেখা, খেলাধুলা ও আত্মীয়স্বজন বা কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসবে সে একটুও সময় দিতে পারে না। কয়েকদিন আগে এক গৃহশিক্ষক বলছিলেন, দরকার থাকলেও একটা টিউশনি বাদ দিতে বাধ্য হলাম। আমি গেলেই ছাত্রটি কান্নাকাটি করে। সারাদিন কোচিং এবং একাধিক প্রাইভেট পড়তে পড়তে ক্লান্ত। বাড়িতে পড়ার কোনো সময় নেই। আমার দেওয়া পড়াগুলো সে করতে পারে না। অভিভাবককে বারবার বলেছি, দুই একটি প্রাইভেট বাদ দেন। সে এত চাপ গ্রহণ করতে পারছে না। কিন্তু না, মনে হচ্ছে আরেকটা শিক্ষক দিতে পারলে অভিভাবক খুশি হবেন। ছাত্রটির ওপর আমার মায়া হলো। শেষ পর্যন্ত একটা অজুহাত দেখিয়ে আমি নিজেই বাদ দিলাম। কিছুদিন পর শুনলাম ছাত্রটিকে আমার জায়গায় আরেকজন শিক্ষক দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখি যন্ত্রকেও বিশ্রাম দেওয়া হয়। কিন্তু এক শ্রেণির অভিভাবক সন্তানদের তাও দিতে রাজি নন। ফলে সন্তানরা মানবিকতাহীন ও মূল্যবোধহীনভাবে বেড়ে উঠতে থাকে। অভিভাবকদের এমন আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন অনায়াসে চলে আসে—শিক্ষার্থী, পণ্য ও যন্ত্র কি সমার্থক? দিনাজপুর