২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর সদস্যরা একই সময়ে দেশের ৬৩টি জেলার অন্তত চার শ জায়গায় সিরিজ বোমা হামলা করে পুরো দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। যদিও বাংলাদেশে জেএমবির যাত্রা ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহীতে, তারপরও ২০০৫ সালে সিরিজ বোমা হামলার পর থেকেই মূলত জেএমবি নামটি দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশে জঙ্গিদের উপস্থিতি জানান দেয়। ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার পরও জেএমবির ক্যাডাররা থেমে থাকেনি। তারা একের পর এক বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চোরাগুপ্তা হামলা করে অন্তত ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটায়। আহত করে আরো চার শতাধিক ব্যক্তিকে। এ ঘটনার পর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী গণহারে তাদের গ্রেফতার করতে শুরু করলে তাদের আস্ফাালন কমে যায়। অনেকদিন তাদের তত্পরতা লক্ষ করা যায়নি। তবে সম্প্রতি আল কায়েদা প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির বাংলাদেশ সম্পর্কে ভিডিও বার্তা ও ময়মনসিংহের ত্রিশালে দণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ তিন নেতাকে মুক্ত করতে জেএমবি সদস্যদের দুঃসাহসিক অভিযান সকলের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। এখন জঙ্গিদের ব্যাপারে নতুন করে হিসাব নিকাশ শুরু করতে হবে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর কাছ থেকে আটক জঙ্গি নেতাদের ছিনিয়ে নেওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। ত্রিশালের ঘটনায় দেখা গেছে, পুলিশের কাছ থেকে আটক শীর্ষ নেতাদের ছিনিয়ে নেওয়ার সময় জঙ্গি সদস্যরা পুলিশের প্রিজনভ্যান লক্ষ করে গুলি ছোড়ে এবং এতে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এ ঘটনা প্রমাণ করে জঙ্গিরা এখন কতটা শক্তিশালী। পালিয়ে যাওয়া দুর্ধর্ষ দুই জঙ্গি নেতা ও অস্ত্রধারীরা আজো আটক হয়নি। এটা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর এক ধরনের দুর্বলতাই প্রমাণ করে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আটক জঙ্গি নেতারা পুলিশের মোবাইল ফোনে কথা বলেছিল। আর এ কারণেই অভিযানে অংশ নেওয়া জঙ্গি সদস্যরা তাদের আটক নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে জেনে যায় এবং ছিনিয়ে নেওয়ার কাজটি সহজে করে ফেলে। কথিত আছে, আসামিরা কারাগারে বসেই পুলিশ সদস্যদের ম্যানেজ করে বাইরে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারে। এতে করে কারাগারের বাইরে থাকা সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে কারাভোগী আসামিদের যোগসূত্র থেকেই যায়। কারাগারে থেকেই অনেক দাগী আসামি চাঁদাবাজি, চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও হত্যাকাণ্ডসহ যাবতীয় অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বলে বিভিন্ন সময় পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত আরেকটি স্পর্শকাতর সংবাদ হলো কারাগারে বসেই আটক জঙ্গি নেতারা তাদের তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো জানা যায়—পালিয়ে যাওয়া শীর্ষ তিন জঙ্গি নেতা কাশিমপুর কারাগারে থেকেই তিনটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতো। তারা নিজেদের মধ্যে খুদে বার্তা আদান প্রদান করা ছাড়াও কারাগারের বাইরে একটি নম্বরের সঙ্গে তাদের কথাবার্তা এমনকি খুদে বার্তা আদান-প্রদান হতো। চিঠিপত্রের মাধ্যমেও তারা বাইরের সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতো বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—কারাগার থেকে ওই তিন জঙ্গি নেতা কীভাবে মোবাইল ফোন ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে বাইরে যোগাযোগ করতে পারলো? এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না।
অনেকে বলছেন, এটা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। জঙ্গি ইস্যু নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রকে নাক গলানোর সুযোগ না দিয়ে অঙ্কুরেই এর তত্পরতা রুখে দিতে হবে। কারণ আমরা দেখেছি, তালেবান ইস্যুতে আমেরিকার হস্তক্ষেপে আফগানিস্তানে কী পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা এখন ভঙ্গুর। একই ইস্যুতে পাকিস্তানও বিপর্যস্ত। সেখানে প্রতিনিয়ত তালেবান চোরাগুপ্তা হামলা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানে তালেবান ইস্যুতে সন্ত্রাস দমনের নামে আমেরিকা থেকে পরিচালিত ড্রোন হামলায় শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আমরা চাই না, শান্তিপ্রিয় আমাদের বাংলাদেশেও জঙ্গি ইস্যুতে একই অবস্থা সৃষ্টি হোক।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
