যখন দেশে কোনো চাঞ্চল্যকর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, যার সঙ্গে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির বা একই পরিবারের সদস্যের মৃত্যু জড়িত থাকে। চাঞ্চল্যের মাত্রা সাপেক্ষে কর্তাব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন এবং তাদের ওপর এতদসংক্রান্ত অর্পিত দায়িত্ব দায়সারাভাবে সম্পন্ন করে দায়মুক্তির তৃপ্তি খোঁজেন। তারপর যথারীতি সড়ক পরিবহনের ধারা আগের মতোই চলতে থাকে এবং আরেকটি দুর্ঘটনার আগে এ দেশে একটি জোড়াতালি দেওয়া সড়কব্যবস্থা নিয়ে কারো টনক নড়ে না। তারপর আবার কিছুদিনের জন্য বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ-দুঃখ, বক্তৃতা-বিবৃতি, তদন্ত, প্রতীকী এবং লোকদেখানো শাস্তি। আবার সেই সাক্ষাত্ যমদূত চালকদের কিছু লঘুদণ্ডের পর চালকের আসনে প্রত্যাবর্তন।
এক জরিপে জানা যায়, দুর্ঘটনার জন্য প্রায় ৯৯ ভাগ চালক নিজেই দায়ী। এ ক্ষেত্রে জাল ড্রাইভিং লাইসেন্সের সহজপ্রাপ্যতাও একটি কারণ। জাল ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর চেয়ে কোনো অংশেই কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশে লাইন্সেস পাওয়া পেশাদার চালক বর্তমানে সাড়ে ছয় লাখ। এদের অধিকাংশই শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত, প্রশিক্ষণহীন, নিজের বা অন্যদের জীবনের মূল্য বোঝার ক্ষমতা বিবর্জিত এক ধরনের মূঢ় মানুষ। যারা সচেতনভাবে নয়, হিতাহিতবোধশূন্যতার কারণেই ঐ দুর্ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। প্রশিক্ষণ মানুষকে চারপাশ সম্বন্ধে সজাগ ও অবহিত করে। জীবন, পৃথিবী, পারিপার্শ্ব বা জীবনের ভালোমন্দ সম্বন্ধে উচ্চতর মানবিক বোধের জন্ম দেয়। ফলে নিজের জীবনের মূল্য, অর্থ বা গুরুত্ব সে আরো স্পষ্ট করে বুঝতে পারে। তাই অন্যের জীবনের দাম বা ক্ষতির বেদনাও তার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। ফলে সে তখন শুধু গাড়ি চালায় না, পাশাপাশি মানুষকে রক্ষাও করে, ব্যবসায় ব্যর্থ হলে তার খেসারত দিতে হয় দেউলিয়া বা কপর্দকশূন্য হয়ে। কিন্তু যদি গাড়ি চালাতে গিয়ে মুহূর্তের ভুলে তার ক্ষতি হয় খুবই নির্মম, এই চালক যদি বাসের বা ট্রাকের হয়, তবে কেবল নিজের নয়, এক মুহূর্তে সে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে।
উন্নত দেশগুলো কাউকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ব্যপারে খুবই হুঁশিয়ার। লাইসেন্স দেওয়ার আগে দেখে নেওয়া হয় তিনি একজন শিক্ষিত বা সচেতন মানুষ কিনা, ড্রাইভিংয়ের জটিল নিয়মকানুন বোঝার, আত্মস্থ করার বা মুহূর্তের দরকারে প্রয়োগ করার মতো ক্ষিপ্র মেধা আছে কিনা, চারপাশে মানুষ, পৃথিবী ও পরিবেশ সম্বন্ধে তিনি সজাগ বা মানবিকবোধে জাগ্রত কিনা। একজন নির্বোধ বা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানুষকে বাস-ট্রাকের লাইসেন্স দেওয়া আর অস্ত্র হাতে একজন দুর্বৃত্তকে খুন করার ঢালাও লাইসেন্স দিয়ে কোনো লোকালয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া প্রায় একই ব্যাপারে। আমাদের দেশে গণপরিবহনে দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ার জন্য অপ্রশিক্ষিত চালকের হাতে চালনার দায়িত্ব চলে যাওয়াকে প্রধান কারণ হিসাবে অভিযুক্ত করেছেন দেশের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। দেশে বিদ্যমান ব্যবস্থায় চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ সীমিত। বিদ্যমান যানবাহনের সংখ্যার বিপরীতে চালকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর দেশে ৫০ হাজার নতুন যানবাহন রাস্তায় নামছে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে মাত্র বছরে ১০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব হয়। অর্থাত্ প্রতি বছর ৪০ হাজার যানবাহন লাইসেন্স বা প্রশিক্ষণবিহীন চালকের হাতে চলে যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬১ জেলা পরিষদে ১৫ দিনের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ জেলা পরিষদের নিজস্ব অর্থে অনেক সেবাধর্মী কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে চালক প্রশিক্ষণের কাজটি যুক্ত হবে। জেলা পরিষদের রাজস্ব বাজেটে আত্মকর্মসংস্থান জীবনমান উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কাজে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে।
ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশের গবেষণায় জেলা পরিষদের মাধ্যমে ১০/১৫ দিনের সংক্ষিপ্ত ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বন্যা, সাইক্লোন, হারিকেন, সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা মাত্র। ত্রাণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় মানুষকে পরনির্ভরশীল করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ড্রাইভিং ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি কোর্স সড়ক দুর্ঘটনা চিরতরে বন্ধ করতে পারে। এজন্য জেলা উপজেলা ইউনিয়নে সরকারি/বেসরকারি একাধিক ইনস্টিটিউট অব ড্রাইভিং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তর্জাতিকমানের ড্রাইভার তৈরির কোর্স কারিকুলাম, একাডেমিক এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে ডিপ্লোমা শিক্ষাবোর্ড।
চট্টগ্রাম
