বুড়িগঙ্গায় দিনে যাচ্ছে সাড়ে ২১ হাজার ঘনমিটার বিষাক্ত বর্জ্য
আদালতের কাছ থেকে তিন দফা সময় নিয়েও স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মন্থরগতি
স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রকল্প এলাকায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসনসহ ৫০ একর জমি দাবি
রাজধানীর হাজারিবাগের চামড়া শিল্পের দূষণ ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ফলে নানাবিধ রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ছে হাজারিবাগ ও এর আশপাশের এলাকায়। বিশেজ্ঞরা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে এখানকার ট্যানারি কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে না নিলে পুরো এলাকায় ভয়ানক স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। ট্যানারি সরানোর ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও পরবর্তী সময়ে আদালতের দেয়া দুই দফা সময়ও পেরিয়ে গেছে আরো অনেক আগেই। অবশ্য এ ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাজারিবাগের ট্যানারি শিল্পকে সাভারে সরিয়ে নিতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছে। এ সংক্রান্ত প্রকল্পের মেয়াদে অর্থাত্ ২০১৬ সালের আগেই স্থানান্তরের সব কাজ শেষ হবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ইত্তেফাককে বলেছেন, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে হাজারিবাগ ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি ট্যানারি স্থানান্তর কার্যক্রম শুরু করতে উদ্যোক্তাদের প্রতিও আহবান জানান।
তবে ২০১৬ সালের মধ্যে স্থানান্তরের সব কার্যক্রম শেষ হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে করা দাবি কতটুকু বাস্তবসম্মত তা নিয়ে ট্যানারি শিল্পের উদ্যোক্তারা সন্ধিহান। মালিক পক্ষ মনে করছে, নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর হওয়ার আগে যেসব কার্যক্রম রয়েছে তা এখনও বাস্তবে কিছুই হয়নি।
পেছনের কথা
জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী দেশীয় কাঁচামাল নির্ভর রপ্তানিমুখী এই চামড়া শিল্পের কার্যক্রম গত প্রায় ৬২ বছর ধরে ঢাকার হাজারিবাগে পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৫১ সালের ৩ অক্টোবর ঘোষিত এক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তত্কালীন সরকার ভূমি অধিগ্রহণপূর্বক এ শিল্পকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাজারিবাগে স্থানান্তর করে। হাজারিবাগে বর্তমানে ছোট-বড় মিলে প্রায় ১৮৫টি চামড়া শিল্প কারখানা রয়েছে। প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর এসব কারখানায় এক কোটি ৮০ লাখ বর্গমিটার চামড়া প্রক্রিয়াজাত হয়।
কেন স্থানান্তর দরকার
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাজারিবাগে অবস্থিত চামড়া শিল্প কারখানাগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার পরিবেশ দূষণকারী তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে মিশে। এর মধ্যে ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম, সালফার, অ্যামোনিয়াসহ ৬২ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বুড়িগঙ্গা নদী ও সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। হাজারিবাগ এলাকার জনজীবনও দারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বিভিন্ন সংগঠনের দাবি ও
সরকারের উদ্যোগ
হাজারিবাগের ট্যানারি শিল্প ইউনিটগুলো স্থানান্তরের জন্য এলাকার অধিবাসী, বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসাসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাও ট্যানারি শিল্প ইউনিটগুলো যতদ্রুত সম্ভব অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ ও নতুন কয়েকটি প্রয়োজনীয় অংশ অন্তর্ভুক্তিসহ অন্যান্য পূর্ত কাজ সম্পাদনে কলেবর, ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে এ সংক্রান্ত খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
অর্থ বিভাগের ২ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখের মতামতে বলা হয়, সংশোধিত ডিপিপির প্রাক্কলিত ব্যয় ৮২৭ দশমিক ৯৯ কোটি টাকার মধ্যে সিইটিপি, ডাম্পিং ইয়ার্ড, এসটিপি ও এসপিজিএস এর প্রাক্কলিত ৬৩৬ দশমিক ৭৯ কোটি টাকা ১০০ শতাংশ ঋণ এবং অবশিষ্ট ১৮৯ দশমিক ২০ কোটি টাকার ৬০ শতাংশ (১১৩ দশমিক ৫২ কোটি টাকা) ঋণ ও ৪০ শতাংশ (৭৫ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা) ইক্যুইটি হিসেবে গণ্য হবে।
স্থানান্তরের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আবাসন জরুরি:উদ্যোক্তাদের বক্তব্য
ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)-এর চেয়ারম্যান হাজী মো. বেলাল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্থানান্তরের বিষয়ে আমরা ত্রিপক্ষীয় (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন-বিসিক, বিএফএলএলএফইএ এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএ) সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছি। তা বাস্তবায়ন হলে ট্যানারি শিল্পনগরী স্থানান্তর সহজ হবে।’ তিনি বলেন, তবে নতুন এমওইউতে এই খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এ খাতের যে শ্রমিক রয়েছে তারা অত্যন্ত দক্ষ ও পরিশ্রমী। দীর্ঘদিন থেকে তারা হাজারীবাগ এলাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছে। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। কিন্তু নতুন শিল্পনগরীতে এসব শ্রমিকের আবাসন, শিক্ষা, চিকিত্সা ব্যবস্থা কি হবে—এ বিষয়ে তেমন কিছু বলা নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে এ বিষয়ে অবগত করে এর সুরাহার জন্য আবেদন জানিয়েছি। আমরা শ্রমিকদের থাকার জন্য নতুন করে ৫০ একর জমি বরাদ্দ রাখার জন্য দাবি জানিয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়া আমাদের মেশিনারিজের সঙ্গে ব্যাংকিং খাত জড়িত। আমরা চাইলেই মেশিন স্থানান্তর করতে পারবো না যদি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো মালামাল স্থানান্তরের অনুমতি না দেয়।’
স্থানান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) মহাসচিব মো. আব্দুল হাই বলেন, বহু পুরানো এ শিল্প স্থানান্তর করতে হলে এর সবগুলো দিক বিবেচনা করতে হবে। এর সঙ্গে যাদের রুটি-রুজির প্রশ্ন রয়েছে তাদেরও একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এর সঙ্গে জড়িত অন্তত ১২টি ব্যবসায়ীক গোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করতে হবে।
সিইটিপি স্থাপনে মন্ত্রীর নির্দেশ এবং ...
এদিকে শিল্পমন্ত্রী গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সাত দিনের মধ্যে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ কাজ শুরুর নির্দেশ দিলেও সেই কাজ এখনও শুরু হয়নি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয়ে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানাগুলোকে সাভারে স্থানান্তরসহ ঢাকা চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় হাজারীবাগ থেকে দ্রুত ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয়। শিল্পমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী সিইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ৮২ জন ট্যানারি মালিক তাদের প্লটের বিপরীতে লে-আউট প্ল্যান জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫টি লে-আউটের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব প্লটের নকশা অনুযায়ী দ্রুত নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে বলে সভায় উদ্যোক্তারা মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন।
তিনি জানান, সরকার এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ইতিমধ্যে ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমি উন্নয়ন করে ১৫৫ শিল্প ইউনিটের অনুকূলে ২০৫টি প্লট বরাদ্দ করা হয়েছে। একটি চীনা কোম্পানিকে প্রকল্প উন্নয়নের কাজ দেয়া হয়েছে। ট্যানারি মালিকদের কমিটি করে অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী স্থানান্তর শুরু করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানান্তর কার্যক্রম শুরু হলে সরকার পর্যায়ক্রমে ক্ষতিপূরণের ২৫০ কোটি টাকা ছাড় করবে বলেও উদ্যোক্তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ ও বেঁধে দেয়া সময়
শেষ হয়েছে অনেক আগে
২০০৯ সালে ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরের বিষয়ে রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে ২০১০ সালের মধ্যে ট্যানারি অন্যত্র স্থানান্তর করতে বলা হয়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে ট্যানারি সরানো সম্ভব হয়নি। পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দুই বছর সময় চায়। কিন্তু আদালত দুই বছর সময় না দিয়ে প্রথমবার ছয় মাস সময় দেয়। পরে আরো দুই দফায় ছয় মাস করে সময় বাড়ানো হয়। এরপর থেকে বিষয়টি সেভাবেই ঝুলে আছে।
