সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কেটেছে তার শৈশব। অফিস থেকে বাবা ফোন দিয়ে গান শোনাতেন, মেয়ে তা শুনেই নেচে উঠত। কথা বলার আগেই আধো আধো বোলে গান গাইতে গাইতেই সুর আর সংগীতের সাথে হূদ্যতা। আর সেই ছোট্ট বয়সেই অর্জন করেন নতুন কুঁড়ি, শাপলা কুঁড়ি অথবা জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় দেশসেরা হওয়ার গৌরব! আজ তিনি সমান পারদর্শী সংগঠক হিসেবেও। আজকের অন্যতারুণ্য-এ মেধাবী এই তরুণী মল্লিকা রায়ের গল্প বলেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
মায়ের খুব শখ মেয়ে গান গাইবে, তার গান শুনবে সারা দেশের মানুষ। আর মেয়েরও তাতে কোনো আপত্তি নেই। মা যখন টেলিভিশনে গান শোনাতেন, আহ্লাদ করে বলতেন, ‘আমার মেয়েও একদিন এখানে গান গাইবে!’ স্বপ্ন পূরণে শুরু হয় প্রস্তুতি পর্ব। পটুয়াখালী শহরে খেলাঘর আসরে যুক্ত হওয়া স্কুল শুরুর আগেই, ছিলেন রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন পরিষদের সঙ্গেও। মল্লিকা যখন নার্সারিতে পড়েন, তখনই একবার মঞ্চে গান গেয়ে মাতিয়ে দিলেন সবাইকে। মল্লিকার আর পিছনে তাকাতে হয়নি। ২০০৩ সালেই নতুন কুঁড়িতে অংশ নেন, স্থানীয় ধাপ পার করে শ্রেষ্ঠ হন জাতীয় পর্যায়ে। এরপর ২০০৪ সালে শাপলা কুঁড়িতে জাতীয় পর্যায়ে দেশাত্মবোধক গানে প্রথম হন তিনি। পরের বছরই একই আসরে রবীন্দ্রসংগীতে দ্বিতীয় সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন মল্লিকা। এ ছাড়া জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় একাধিক সম্মাননা রয়েছে তার। বর্তমানে ছায়ানটের প্রথম বর্ষে পড়ছেন তিনি। সুরসাধনায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটাও রপ্ত করে নিতে চান। মল্লিকার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, শৈশব থেকেই এত কিছু করার পেছনে মূল অনুপ্রেরণা কীভাবে পেলেন? সবার আগে বাবা-মা, তারপরেই বন্ধুদের কথা বলেন তিনি। আর তারচেয়ে বড় বিষয় ছিল নিজের ভালোলাগা। কারও উপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দিতে নেই। মল্লিকার গানের সাথে যেমন হূদ্যতা ছিল, তেমনি পেয়েছিলেন সঠিক দিকনির্দেশনা, সাথে ছিল অধ্যবসায়। এই তিন মিলিয়েই আজ তিনি এ অবস্থানে এসেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সহপাঠ্যক্রমিক কাজে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন মল্লিকা। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা আমাদের গণ্ডিবদ্ধ করে দেয়। আর তাছাড়া একঘেয়েমি চলে আসে একটা সময়। এসব বিবেচনায় গান বরং তাকে আরও উচ্ছল করে দেয় প্রতিদিন। শুধু গানই নয়, ছবি আঁকা, বিতর্কের সাথেও মল্লিকার রয়েছে সখ্যতা। নিজের কল্পনাকে সময় পেলেই এঁকে ফেলেন ক্যানভাসে। তার রংতুলির আঁচড়ে খোঁজ মেলে আবহমান বাংলার প্রকৃতি থেকে শুরু করে প্রতিদিনের জীবনধারার। আর বিতর্ক? নিজেকে পরিশুদ্ধতায় পূর্ণ করতে এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কী হতে পারে! এমনটাই মত মল্লিকার। যুক্তি দিয়ে সব উপাত্ত যাচাই করতে করতে জানার দুনিয়াটাও সমৃদ্ধ হয় বেশ। স্কুলে ঢের বিতর্ক করা হয়েছে। পুরস্কারও মিলেছে অনেক।
এ বছর ৭ম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রেস ও মিডিয়া বিভাগে কাজ করছেন তিনি। আর গান গাইলে ছবি আঁকলে যে আর কিছুতে থাকা যাবে না, এমন ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি। লেখালেখির হাতটাও তার বেশ চমকপ্রদ। নিজের ভাবনাটাকে খুব গুছিয়ে লিখে ফেলতে পারেন তিনি। মল্লিকা বাবা-মায়ের বড় সন্তান। অরুণ আর দেবদত্তা তার দু’ভাই বোন। তারাও তাদের দিদির সব কাজের সবচেয়ে বড় সমালোচক! বাবা অমল রায় পেশায় প্রকৌশলী, মা গায়ত্রী মৃধা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। আদর শাসনে কেটেছে ছেলেবেলা, সেই পটুয়াখালীতেই। এরপর হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়ে এবার নিজের পছন্দের কোনো বিষয়ে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছে। যেটাতেই পড়েন, আর যাই করেন, নিজের সেরাটা দিতে চান সেখানেই। সুযোগ পেলে এমন কোনোও গবেষণায় নিবেদিত করতে চান নিজেকে, যা তাকে দেশের জন্য কিছু করার সুযোগ করে দেবে। আর মল্লিকারা আছে বলেই, তাদের উপর ভর করে এই তারুণ্য এগিয়ে যায় সামনের দিকে।
