কান উত্সব এখন সামাজিক প্রতিবাদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম

আপডেট : ২১ মে ২০১৯, ২২:১২

বিশ্বের শত শত চলচ্চিত্র অনুরাগী নোঙর ফেলেছেন সেলুলয়েডের তীর্থস্থান খ্যাত ফ্রান্সের সাগর পাড়ের শহর কানে। চলছে ৭২তম কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব। সারাবিশ্বের বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র তারকারা নিজেদের শুটিং শিডিউল পরিবর্তন করেন এই উত্সবের জন্য। তাই তামাম দুনিয়ার নজর এখন সেখানে।

তবে প্রতিবছরই একটু একটু করে বদলাচ্ছে কান উত্সবের আদল। সমৃদ্ধ হচ্ছে এই বিশ্ব প্ল্যাটফর্ম। একসময় এই উত্সবের লালগালিচায় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা পায়চারি করে নির্দিষ্ট পথ দিয়ে বেরিয়ে ঝাঁ-চকচকে গাড়িতে চড়ে হোটেলে ফিরতেন। কিন্তু এখন অনেকেই প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন প্রতিবাদ জানাতে। এ প্রতিবাদ শুধু চলচ্চিত্র বিষয়ক নয়। সামাজিক যে কোনো বিষয় নিয়ে। মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে সারাবিশ্বে নারীদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদটি ছড়িয়েছিল এই কান উত্সবের লালগালিচা থেকেই। ‘হ্যাশট্যাগ মি টু’ আন্দোলন এখান থেকেই জনপ্রিয়তা পায়।

ঠিক তেমনি গত শনিবার কানের পালে দ্য ফেস্তিভাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরের ফটক স্লোগান-প্রতিবাদে    মুখর হয়ে ওঠে। সবার হাতে ছিল সবুজ কাপড়, মুখে ছিল একই কথা, ?‘নারীদের জন্য সংহতি’। মূলত এটি ছিল আর্জেন্টিনার গর্ভপাত আইনের প্রতিবাদ। ‘লেট ইট বি ল’ প্রামাণ্যচিত্রের কলাকুশলী ও বেশ কয়েকজন নারী সমাজকর্মী মিলে এই প্রতিবাদে অংশ নেন।

আর্জেন্টিনায় ধর্ষণের শিকার হলে কিংবা অন্তঃসত্ত্বা নারীর স্বাস্থ্য যদি ঝুঁকির মুখে থাকে তাহলেই কেবল গর্ভপাতের অনুমতি রয়েছে। দেশটিতে এই আইন নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। বিশেষ করে নারীরা গর্ভপাতকে বৈধতা দেওয়ার জন্য দেশটিতে কয়েকমাস ধরে আন্দোলন করছেন। নিয়মিত মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং হচ্ছে। গর্ভপাতকে বৈধতা দেওয়ার বিল পাস করার ব্যাপারে বিপুল সমর্থন রয়েছে আর্জেন্টিনায়। কিন্তু দেশটির সিনেট গত বছর তা বাতিল করে দেয়। এরপর প্রতিবাদের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। গর্ভপাতের বৈধতা চেয়ে আন্দোলনকারীরা সাধারণত সবুজ রুমাল ব্যবহার করেন। আর তাদের বিপক্ষরা বেছে নেয় নীল। ‘লেট ইট বি ল’ প্রামাণ্যচিত্রেও এই গল্প উঠে এসেছে।

সবুজ প্ল্যাকার্ডধারী বেশ কয়েকজন সমর্থনকারীকে এবার আমন্ত্রণ জানায় কান কর্তৃপক্ষ। সেই দলে ছিলেন আর্জেন্টাইন চলচ্চিত্রকার ফার্নান্দো সোলানাসের ছেলে হুয়ান সোলানাস। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি লজ্জাজনক। লুকিয়ে অনিরাপদভাবে গর্ভপাতের কারণে আর্জেন্টিনায় প্রতি সপ্তাহে একজন নারীর মৃত্যু হয়।’

এর আগে লালগালিচায় কলম্বিয়ার প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মরিসিও লেজামাকে খুনের প্রতিবাদ জানান দেশটির নির্মাতা সিরো গুয়েরা ও ফ্রাঙ্কো ললি এবং চিত্রনাট্যকার ক্যারোলিনা স্যানিন। স্প্যানিশ ভাষায় প্ল্যাকার্ডে প্রতিবাদের কথা লিখে তুলে ধরেন তারা। একইসঙ্গে বিচার ও শাস্তি চেয়েছেন মরিসিওর সতীর্থরা। তাদের হাতে ছিল নিহতের ছবি। এছাড়া ইউক্রেনের চলচ্চিত্রকার ওলেগ সেন্তসভকে রাশিয়ার বন্দিদশা থেকে মুক্তির আহ্বান জানানো হয় কান উত্সবের বাণিজ্যিক শাখা ভিলেজ ইন্টারন্যাশনালে ইউক্রেনিয়ান পার্টির সময়। সেসময় দেশটির সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

তবে এবারের উত্সবে প্রতিবাদের খাতা খুলেন এডওয়ার্ড ওয়াটস, ওয়াদ আল কাতিব ও হামজা। তারা তিনজন তিনটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন উত্সবের দ্বিতীয় দিনেই। সেখানে লেখা ছিল ‘স্টপ বোম্বিং হসপিটালস’, অর্থাত্ হাসপাতালে বোমা নিক্ষেপ বন্ধ করুন। সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের হাসপাতালে বোমা নিক্ষেপের কারণে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে তিনজন মিলে এই আহ্বান ছড়িয়ে দেন উত্সবের লালগালিচায় দাঁড়িয়ে। কান তাই আজ শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উত্সব নয়, বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সামাজিক প্রতিবাদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।