তেষট্টি বছরের জীবনের প্রথম তের বছর ব্যতীত বাকী পঞ্চাশ বছরই যিনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাংলা, আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত ও বর্মী ভাষায় লিখিত দুষ্প্রাপ্য পুঁথি, পাণ্ডুলিপি উদ্ধার এবং বহুসংখ্যক দুর্লভ গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকা ও লোক সাহিত্য—সংস্কৃতির নানা উপাদান সংগ্রহপূর্বক জাতির ঐতিহ্য সংরক্ষণে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন—তিনি আবদুস সাত্তার চৌধুরী; আমাদের একজন কীর্তিমান পূর্বপুরুষ, প্রাজ্ঞ মনীষী। ৮ মার্চ ২০১৪ তার বত্রিশতম প্রয়াণ দিবস; আমরা এই কৃতী মনীষীকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ও তার কর্মের প্রশংসা করি।
আবদুস সাত্তার চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ হুলাইন গ্রামে, ৩ মার্চ ১৯১৯ সালে। তার পিতা আবদুল মজিদ চৌধুরী, মা রাফিয়া খাতুন। পারিবারিক সূত্রে আবদুস সাত্তার চৌধুরী ছিলেন মনীষী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের মামাতো ভ্রাতুষ্পুত্র; অর্থাত্ সাহিত্যবিশারদের মাতামহ ওমেদ আলী চৌধুরী ও আবদুস সাত্তার চৌধুরীর প্রপিতামহ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ছিলেন আপন সহোদর। শুধু আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ বলে নয়, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম (বর্তমানে তিনটি স্বতন্ত্র জেলা) অঞ্চলে প্রাচীন পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি এবং লোক সাহিত্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের সুযোগ্য ও হাতে গড়া শিষ্য তিনি।
আবদুস সাত্তার চৌধুরী শুধু সংগ্রাহক ছিলেন না, তিনি বহু ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন। উর্দু, আরবি, ফার্সি, হিন্দী, সংস্কৃত, পালি ও বর্মী ভাষায় লেখা পাণ্ডুলিপি পড়তে জানতেন তিনি। বাংলা একাডেমি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় জাদুঘর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের গ্রন্থাগার এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর আবদুস সাত্তার চৌধুরীর দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহশালায় সমৃদ্ধ হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পর আবদুস সাত্তার চৌধুরী হলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যকের সংগ্রাহক এবং এ বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ।
১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমিতে তিনি সংগ্রাহকের চাকরিতে যোগ দেন প্রাইমারি স্কুলের ২৫ বছরের শিক্ষকতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে। বাংলা একাডেমির তত্কালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করলে তার আহ্বানে আবদুস সাত্তার চৌধুরী অনিয়মিত পুঁথি সংগ্রাহক হিসেবে যোগ দেন। অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল করিম ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের আনুকূল্য পেয়ে সাত্তার চৌধুরী বহুসংখ্যক পুঁথি এবং সংস্কৃত, পালি, ফার্সি, বাংলা আরবি, উর্দু ও বর্মী ভাষায় রচিত পাণ্ডুলিপি, দুষ্প্রাপ্য পুস্তক ও সাময়িকীর মাধ্যমে গড়ে তোলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব ও সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা। এসব সংগ্রহ নিয়ে ১৯৭২ সালে গড়ে ওঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি ও দুষ্প্রাপ্য শাখা। সংগ্রাহক আবদুস সাত্তার চৌধুরী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি বিশেষজ্ঞ হিসেবে গন্থাগারিকের সহকারি পদে দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র মুহম্মদ ইসহাক চৌধুরী দীর্ঘ ৩ দশক ধরে সে দুষ্প্রাপ্য শাখার ভারপ্রাপ্ত ছিলেন।
লেখক :গবেষক, প্রাবন্ধিক
[email protected]
