দুই মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৪, ২১:১৮
কলেজ হইতে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হইবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজকে—সরকার এইরকম ভাবিতেছে, তবে চূড়ান্ত ঘোষণা আসে নাই। আর ইহা লইয়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে কয়েকদিন আগে শুরু হয় তুলকালাম কাণ্ড। বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থানকারীদের মিছিল-সমাবেশের কারণে হাসপাতালের সেবাকার্য ভাঙ্গিয়া পড়িবার উপক্রম হয়। ইহাতে জরুরি চিকিত্সা সেবা বিঘ্নিত হয় ও ভোগান্তিতে পড়ে চিকিত্সাসেবা লইতে আসা সাধারণ মানুষ। বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণের পক্ষে রহিয়াছেন চিকিত্সকরা। আর বিপক্ষ অবস্থান নিয়াছেন নার্সসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। নার্স ও কর্মচারীদের কর্মবিরতিই মূলত অচলাবস্থার জন্য দায়ী। একইভাবে বত্সর দুয়েক আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করিবার পদক্ষেপ নেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু মূলত কর্মচারীদের বাধা ও আন্দোলনের মুখেই তাহা বানচাল হইয়া যায়। এইদিকে কলেজকে বিশ্ববিদ্যলয়ে উন্নীত করিবার দাবিতে আন্দোলন করিতেছেন ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। মেডিকেল কলেজের কর্মচারীরা কেন মর্যাদার উন্নয়ন চাহেন না, তাহা এক ভাবনার বিষয় বটে! পিজি হাসপাতালকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এতটা বাধার মুখে পড়ে নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইবার পর প্রতিষ্ঠানটিতে গতিশীলতা আসিয়াছে, সেবার মান বাড়িয়াছে, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হইয়াছে, বিভাগগুলিতে অধিক বিশেষায়িত উপবিভাগ সৃষ্টি করা সম্ভব হইয়াছে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধিই নহে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় অনেক সুবিধা হইয়াছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইলে প্রাচীন ও বৃহত্ দুইটি চিকিত্সা শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এই সকল সুযোগই পাইবে এবং শিক্ষা ও সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি পাইবে। বাংলাদেশে মর্যাদার বিচারে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়াই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভীষ্ট লক্ষ্য হইবার কথা। সমস্যা হইল প্রতিষ্ঠানটির সেইরূপ অবকাঠামো রহিয়াছে কিনা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইবার চাহিদা সমাজ বোধ করে কিনা, উপরন্তু সেই প্রকল্পে অর্থবরাদ্দ হইবে কিনা। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রাচীন ও বৃহত্ এবং তাহাদের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নাই। আর অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি সমস্যা নহে, কারণ সরকার নিজেই এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করিতে চাহিতেছে। এই পরিস্থিতিতে কর্মচারীদের এই আন্দোলন কাম্য নহে। তবে কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইলে কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হইবে? আন্দোলনকারী কর্মচারীরা অবশ্য তেমন জোরালো কিছু বলিতে পারেন নাই। তাহাদের যুক্তি হইল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইলে রোগীদের সিট ভাড়া, ঔষধের মূল্য ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বৃদ্ধি পাইবে। ইহা বেসরকারি ক্লিনিকে পরিণত হইবে। তাহাদের এই দাবি বিবেচনাসাপেক্ষ। তবে প্রতিষ্ঠানটিতে যে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাইবে তাহা অপরিমেয়। উল্লেখ্য, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হইতে আসা সাধারণ কিংবা কম শিক্ষিত উদ্ভ্রান্ত মানুষদের পক্ষে হাসপাতালের অলি-গলির সব খবর জানা সম্ভব নহে। এই সুযোগে কর্মচারীদের ভর্তি করাইয়া দেওয়া, সিটের ব্যবস্থা করিয়া দেওয়া, ডাক্তার পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেওয়া ইত্যাদি নানান সূত্রে অর্থ হাতাইয়া লইবার এক চর্চা রহিয়াছে হাসপাতালগুলিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইলে এইসব দুর্নীতিকে একক প্রশাসনের আওতায় আনিয়া রহিত করিয়া দেওয়া সম্ভব। অর্থ উপার্জনের এই সহজ রাস্তা বন্ধ হইয়া যাইবার আশঙ্কা হইতেই কর্মচারীরা এই আন্দোলন করিতেছেন বলিয়া ধারণা করা যায়। আমরা মনে করি, চিকিত্সা শিক্ষার প্রসার ও গবেষণার সুযোগ কাজে লাগাইয়া উন্নত চিকিত্সাসেবা প্রদানের এই সুযোগ ঐ দুই প্রতিষ্ঠানের নেওয়া উচিত। আমরা আশা করি কর্মচারীদের বোধোদয় হইবে এবং আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার আশু সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করিবে।