দুঃখ গেঁথে থাকে জীবনের পরতে পরতে। সুখের পাশে পাশে হাঁটে জীবনভর। দুঃখের ছায়া মারিয়ে তবু জীবন সুখ খোঁজে, সুখি হতে চায়। সে সুখের নাগাল পায় ক’জন? সন্ধান পাক কি-বা না পাক তবু চলে ...সুখের এ অভিনয়... সে অভিনয় করতেও কেউ কেউ হেরে যায় সাত পাকে বাঁধা জীবনের ঘুর্ণি-ঘুরনের কাছে। ডুবে যায় কৃষ্ণ সাগরের অতলে-দুঃখের নূড়ি পাথরের গা ঘেঁষে। কেন এমন ? আলোর ঝলমলে ঝলকানিতে দেহ-শৈলির যাদু মন্ত্রে যে মানুষগুলো স্বপ্ন আশায় ভাসায়-ডুবায় রঙে রঙিন লাখো মানুষ তাদের অন্তরে যখন বাস করে বিদগ্ধ বিষের পোড়ন-পেয়ালা তখন প্রশ্ন করে বসে নিজেরই মন, মানুষ এমন দুঃখী হয়?
এ মাসেই জন্ম মধুবালার। ...হ্যাঁ বলিউডি সেই বিখ্যাত ‘মুঘল-এ-আজম’ সিনেমার নায়িকা মধুবালা। জন্মের সময়ে হূদপিণ্ডে ফুটো নিয়ে জন্মানো মধুবালার হূদয় বড়বেলা হয়েছিল ফুটো থেকে ছিন্ন-ভিন্ন-রক্তাক্ত। প্রেমিকের হাত ধরে ঘর ছাড়ার বাসনাতেও প্রেমিক করেনি বরণ বরং ছিটকে ফেলেছে অনাদরে। প্রেমিকার মন কী করে সয়!! অভিমানে আরেক পুরুষের ঘরোনি! তাতে সুখ আসে কি হূদয়ে? যাতনার পিড়ন বাড়ে হারে হারে। মধুবালা সে পিড়নে লাইট সাউন্ড অ্যাকশন আর রংকরা পোশাক-ডায়লগ-এর আড়ালে পুড়তে থাকে সব চোখের অগোচরে। ...হূদয়ে জন্মগত ফুটো নিয়ে যে জন্মালো জীবনের আশায় একদিন সে চলে গেল হূদয়ভাঙ্গা আর্তনাদ নিয়ে জীবনের অন্তরালে! কেবল পড়ে রইল দুঃখগুলো- সময়ের এপিটাপে... ট্রাজেডির শেষের পাতায়...
মধুবালার জন্ম ১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। মৃত্যুর সাল-১৯৬৯, ২৩ ফেব্রুয়ারি। পারিবারিক নাম মমতাজ জাহান দেহলভী হলেও অভিনয় জীবনে প্রবেশের ক্ষণকাল পরে আরেক অভিনেত্রী দেবিকা রানী তার নাম দেন মধুবালা। বলিউডের এই সুন্দরী মেধাবী তত্সময়ে সাড়াজাগানো নায়িকা পরবর্তীতে মধুবালা নামেই বলিউডে পরিচিত হতে থাকেন এবং আজোব্দি মধুবালা নামেই দর্শক অন্তরে জীবিত রয়েছেন।
দিল্লির এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে আতাউল্লা খান এবং বেগম আয়শার ঘরে ৪০-৫০ এর শতকে সাড়া জাগানো নায়িকা-এই মধুবালার জন্ম। এগার ভাই-বোনের মধ্যে পঞ্চম মধুবালা বড় হবার আগেই তার দুই ভাই-তিন বোন মারা গেলে তার পরিবার এক অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে এবং এরই মধ্যে পাকিস্তানের পেশোয়ায় এক টোব্যাকো কোম্পানিতে চাকরিরত আতাউল্লার চাকরি চলে গেলে পরিবারটি এক নিরুপায় কূপে পতিত হয় এবং জীবনের স্রোতস্বিনী টানে দিল্লি ছেড়ে বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) নগরে চলে আসেন জীবিকার খোঁজে। একদিকে সংসারে অভাব-অনটন অন্যদিকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে; আতাউল্লা পথ পেলেও পথের দিশা পান না। শত অভাব থাকলেও পরিবারটির ছিল শিল্প-সংস্কৃতির দিকে যত্নের খেয়াল। একটু-আধটু চর্চাও হতো সময়ে অসময়ে। চেনাজানাও ছিল এ মাধ্যমের মানুষদের সাথে। অভাব যখন ঘার ছেড়ে মাথার উপর বাসা বাঁধে তখন একদিন আতাউল্লার কাছে ডাক আসে তার মেয়েকে শিশু শিল্পি হিসেবে অভিনয় করতে দেয়ার। তখন মধুবালার বয়স সবেমাত্র নয় বছর।
সংস্কৃতির দিকে টান আবার অভাবের সংসারে যদি কিছু টাকা আসে! এই ভেবে সম্মতি ও নয় বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে মধুবালার প্রথম অভিনয়। জাত চেনা যায় আঁশ দেখেও। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করলেও তাঁর ভিতরে জাত অভিনেত্রীর বীজ আছে তা টের পেয়েছিলেন বলিউডের অনেক ফিল্ম-মেকারই। অমিয় চক্রবর্তী তার সিনেমা ‘বসন্ত’তে মধুবালাকে প্রথম কাস্ট করার পর আর ছাড়েননি বহুকাল। মধুবালাও তার শিশুতোষ অভিনয় দিয়ে একে একে মন জয় করে নেন বড় বড় পরিচালকদের। শিশুশিল্পী হিসেবে একের পর এক করতে থাকেন কিদার শর্মার-মমতাজ মহল, ধন্য বগত, অস্পির-পুঁজারী, রাজপুটানী, চতুর্বুজ দেশাইর-ফুলওয়ারীসহ আরো কিছু সিনেমা।
