আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৪, ২১:০০
সমপ্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়া অপহরণ, চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়, প্রতারণা, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন-খারাবি ইত্যাদি অপরাধ বাড়িয়া গিয়াছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। যেমন কয়েক দিন আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় র্যাব পরিচয় দিয়া ঘরের দরজা ভাঙ্গিয়া কালো কাপড়ের মুখোশ পরাইয়া তিন সহোদরকে বাড়ি হইতে তুলিয়া নিয়া যাওয়া হইয়াছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী তাহাদের কোন হদিস এখনও পাওয়া যায় নাই। শুধু অপহরণই নহে, র্যাব-পুলিশের পরিচয় দিয়া দেশে চাঁদাবাজি ও ডাকাতির ঘটনা ইদানীং বৃদ্ধি পাইয়াছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বরাবরই বলিয়া আসিতেছেন যে, এইসব অপরাধের সহিত তাহাদের কেহই সম্পৃক্ত নহেন। তাহাদের বক্তব্য অনুযায়ী মূলত পেশাদার সন্ত্রাসীরাই ইহার সহিত জড়িত। তাহারা ভুয়া র্যাব এমনকি ডিবি পুলিশ সাজিয়া সহজেই অপরাধ করিয়া যাইতেছে। তাহাদের কেহ কেহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হইয়াছে। আমাদের জানামতে এই ধরনের অভিযান অব্যাহত আছে। তাহার পরও কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে, সেই সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আরও গভীরে যাইয়া তদন্ত করা এবং হোতাদের গ্রেফতার করা। উল্লেখ্য, যাহারা এই ধরনের অপরাধের শিকার হইতেছেন, তাহাদের মধ্যে যেমন সাধারণ মানুষ রহিয়াছেন, তেমনি আছেন কোন কোন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও। ফলে জনমনে আতঙ্ক যে বিরাজ করিতেছে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। পত্র-পত্রিকায় প্রায়শ এমন খবরও প্রকাশিত হইতে দেখা যায় যে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার্য পোশাক-আশাক, ব্যাজ ও হ্যান্ডকাফসহ নানা সরঞ্জামাদি বিভিন্ন জায়গায় অনেকটা প্রকাশ্যে বেচাকেনা চলিতেছে। আর ইহা ব্যবহার করিয়া অপরাধীরা দিব্যি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাইয়া যাইতেছে। জনগণকে দিতেছে ধোঁকা। একটি সভ্য দেশে এমনটি কি করিয়া সম্ভব এই প্রশ্নও অমূলক নহে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করিতে হইলে এই হতাশাজনক চিত্রের অতিসত্বর অবসান ঘটাইতে হইবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নামে যেইসব অপরাধ সংঘটিত হইতেছে সেই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত যথাসম্ভব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা মনে রাখা প্রয়োজন ইহাতে খোদ র্যাব-পুলিশেরই বদনাম হইতেছে বেশি। নষ্ট হইতেছে তাহাদের ভাবমূর্তি। তাহাদের ব্যাপারে দেখা দিতেছে আস্থার সংকট। তবে এইখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, যাহারা এই ধরনের অপরাধের শিকার হইতেছে তাহাদের সকলের পূর্ব রেকর্ড যে খুব ভাল, এই ব্যাপারে নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না প্রায়শ। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক ঘটনা বাদ দিলে সাধারণত এমনসব ব্যক্তিদের টার্গেট করা হইতেছে যাহাদের কোন না কোন প্রকার দুর্বলতা বা দুর্নাম রহিয়াছে। যেমন এইক্ষেত্রে যাহাকে অপহরণ করা হইতেছে বা যাহার নিকট হইতে চাঁদা দাবি করা হইতেছে, তাহার জীবনের সমস্ত আয়-উপার্জন হয়তোবা প্রশ্নের বাহিরে নহে। আর সাধারণত যাহারা এইসব অপকর্মের সহিত জড়িত, তাহাদের বেশির ভাগই বেকার, ভবঘুরে বা মাদকাসক্ত। তাহারা হয়তো মনে করে অসত্ ব্যক্তির উপার্জনে তাহারও হিস্যা আছে। যাহারা সত্ পথে উপার্জনে ধন-সম্পদের মালিক হইয়াছেন, তাহাদের ব্যাপারেও কোন কোন ক্ষেত্রে এইরূপ অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকিতে পারে। সমাজের সর্বত্র ঘুষ, দুর্নীতি ও অন্যায়-অপকর্ম বাড়িয়া যাওয়ার কারণেও এইরূপ অপরাধের হার বাড়িয়া যাইতে পারে। আমরা বলি না যে, যাহারা এইরূপ অপরাধ করিয়া বেড়ায়, তাহারা ভাল মানুষ। তবে সমাজে যখন সার্বিকভাবে শুভবোধ জাগ্রত হইবে ও প্রতিষ্ঠিত হইবে আইনের শাসন, তখনই আশা করা যায় যে, এই ধরনের প্রবণতাও কমিয়া আসিবে বা তাহার সুযোগ আর থাকিবে না। গত কয়েক মাস আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নামে এইরূপ নানা অপরাধ বাড়িয়া যাইতে দেখা যায়। তাহারই ধারাবাহিকতা এখনও চলিতেছে। তখন র্যাব ও পুলিশের সেইদিকে ভ্রূক্ষেপ করিবার তেমন একটা সময় ছিল না। বর্তমানে যদিও উপজেলা নির্বাচন নিয়া ব্যস্ততা আছে, তথাপি রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর যাহাই হউক, উত্তপ্ত নহে। এখন এই ধরনের কোন অপরাধ সংঘটিত হইলে তত্ক্ষণাত্ পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করা একান্ত আবশ্যক। আমরা আশা রাখি, এই ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আরও তত্পর হইবে।