বগুড়ার আদমদীঘিতে সোনালী ব্যাংকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে টাকা চুরির ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তদন্ত সংশ্লি¬ষ্টরা। ঘটনার পর থেকে গতকাল রবিবার বিকেল পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) সামসুদ্দিন শরীফ ও ক্যাশিয়ার আজাহারুল ইসলামসহ ১৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক অন্যরা হলেন ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মী আনসার সদস্য মিলন ও পূর্ণদেব, স্থানীয় বিপ্লব ফার্নিচারের মালিক আশরাফুল ইসলাম, কাঠ মিস্ত্রী শাহিনুর ইসলাম, নজরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম, মৃদুল, আব্দুল ওয়াহেদ, ব্যাংকের সাবেক নিরাপত্তা কর্মী রহুল আমিন এবং ওয়েল্ডিং মিস্ত্রী আব্দুল লতিফ, নুর আলম ও পলাশ। এদের মধ্যে সাবেক নিরাপত্তা কর্মী রহুল আমিনকে গতকাল ভোররাতে নীলফামারী থেকে আটক করা হয়।
তবে ব্যাংকের স্বাভাবিক কাজ চালু রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিম্মায় ব্যাংকের ম্যানেজার সামসুদ্দিন শরীফ ও ক্যাশিয়ার আজাহারুল ইসলামকে গতকাল বেলা ১১টায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা পুলিশ পাহারায় ব্যাংকের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লুট হওয়া টাকা উদ্ধার হয়নি।
ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। টাকা লুটের ঘটনায় ব্যাংকের বগুড়া জোনের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আব্দুস ছামাদ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি উল্লেখ করে শনিবার রাতেই থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ব্যাংকের ভল্ট ও সিন্দুকে থাকা ৩২ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৪ টাকার মধ্যে ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৮০০ টাকা লুট হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল সকাল থেকেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত করতে পুলিশ, ডিবি, র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে যান।
এ সময় সোনালী ব্যাংক বগুড়া প্রধান কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আব্দুস সামাদ জানান, পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে ব্যাংকটির রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) টিএম আফজাল হোসেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মুর্তজা আলীকে প্রধান করে তিন সদস্যের পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিগুলো ইতোমধ্যেই তাদের কাজ শুরু করেছে বলেও তিনি জানান।
কমিটিগুলো যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে সাংবাদিকদের জানানো হয়েছে।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত উপ-মহা পরিদর্শক (এডিশনাল ডিআইজি) খুরশীদ আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর তিনি থানায় আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিনি ঘটনার জন্য নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয়টিকে মুখ্য হিসেবে উল্লে¬খ করে বলেন, জানুয়ারিতে কিশোরগঞ্জ শহরে সোনালী ব্যাংকে টাকা লুটের ঘটনার পর ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকে প্রবেশ মুখে, ক্যাশ কাউন্টারে এবং ভল্টে সিসিটিভি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা হলেও সেটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ করেননি। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই দায়ী। সেইসাথে ব্যাংক ম্যানেজার মাঝে মাঝে বিশেষ করে ছুটির দিনে রাতে তার নিরাপত্তা রক্ষীদের তদারকি করার নিয়ম থাকলেও সেটি তিনি গত দুবছরে একদিনও করেননি। সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশের ওসিসহ এসআইদের নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে যে তারা মাঝে মাঝে রাতে ব্যাংক বীমা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করবেন। কোন ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে এবং নিরাপত্তারক্ষীরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করলে শাখা ব্যবস্থাপককে পরের দিন বিষয়টি অবহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পুলিশের তদারকিতেও গাফিলতি ছিল বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন ।
তিনি আরও বলেন, যে সুড়ঙ্গটি ব্যাংকের ভল্টরুমে প্রবেশ করেছে সেটি দিয়ে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ঢোকা সম্ভব নয় । ফলে এই কাজে গ্যাসের ওয়েল্ডিং সম্পর্কে জানা কোন কিশোরকে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। যে কিনা ভেতরে প্রবেশ করে গ্যাস কাটারের মাধ্যমে ভল্ট কেটে টাকা বের করে সুড়ঙ্গ দিয়ে তার সহযোগীদের কাছে দিয়েছে।
গতকাল সকাল থেকে ব্যাংকের সামনে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও গ্রাহকরা। নিজেদের অর্থ গচ্ছিত রাখার পর সুড়ঙ্গ করে তা চুরির ঘটনায় গ্রাহকরা চরম উদ্বিগ্ন। তবে কর্তৃপক্ষ তাদের আশ্বস্ত করেছে ব্যাংকে যথানিয়মে লেনদেন হবে। গতকাল বেলা ১২টা পর্যন্ত ব্যাংকের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর আবার লেনদেন শুরু হয়েছে।
আদমদীঘি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, টাকা উদ্ধারের জন্য পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, সিআইডি ও ডিবি সদস্যরা ব্যাপক তত্পরতা চালাচ্ছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মূল আসামিদের চিহ্নিত করা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, আদমদীঘি উপজেলা সদরে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের দেয়ালের নিচে কেটে সুড়ঙ্গ করে ভল্ট রুমে প্রবেশ করে ভল্ট খুলে ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৮০০ টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
