নদীর কান্না কি কেউ শুনবে না

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৪, ২০:৪৩
‘বালু গাঙ্গের (নদ) পচা পানি আমাগো সব শেষ কইরা দিছে। গাঙ্গতন মাছ ধইরা বেইচ্যা আগে সংসার চালাইতাম। যেই পচা আইলো, আমাগো কপালও খাইলো’—এ ক্ষোভ শুধু শশীমোহনের নয়—বালু, নড়াই ও দেবধোলাই নদের তীরবর্তী ৫০ গ্রামের প্রায় লাখো মানুষের। ঢাকার উপকণ্ঠ ও রূপগঞ্জের কোলঘেঁষে প্রবহমান বালু নদ এখন দূষণ-দখলে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নয়ন জুড়ানো রূপ তার ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল দু’যুগ আগেই। নদে এখন মাছ নেই। বেড়েছে মশার উপদ্রব। কমে গেছে ফসলের উত্পাদন। সংকট দেখা দিয়েছে খাবার পানির। বেড়েছে রোগ-বালাই। পচা পানির কটু গন্ধে তীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে। বিপন্ন হয়ে গেছে পরিবেশ। বিপর্যস্ত মানুষের জীবন। দূষণের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে চলছে নদ দখলের প্রতিযোগিতাও। একসময় ভোরে আর বিকালে হাওয়া বিলাসীরা তার দুই পাড়ে হাঁটতো। তাতে প্রফুল্ল হতো দেহ-মন। নদীপাড়ের হাওয়া, লাখ টাকার দাওয়া—এখন এ প্রবাদ ফিকে হয়ে গেছে। দানবেরা গ্রাস করছে বালু নদকে। দুই তীরে বালু ফেলে ভরাট করতে করতে সংকুচিত করছে বালু নদের প্রশস্ততা। রাজধানী ঢাকার পয়োবর্জ্য ও শিল্প-কারখানার বর্জ্য পড়ে এ নদের পানি এখন আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে। স্থানীয়রা একে ‘পচা’ পানি বলে চেনে। এ পচা পানিতেই বৌ-ঝিয়েরা থালাবাসন পরিষ্কার করছেন। কৃষক গরু-ছাগল গোসল করাচ্ছেন। এমনকি পানির অভাবে লোকজন এ পচা পানিতেই গোসল করছে। নদের একপাড়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। অন্যপাড়ে ঢাকার খিলগাঁওয়ের নাসিরাবাদ, ডেমরা, বেড়াইদ ও ডুমনী ইউনিয়ন। উভয় তীরজুড়ে ফসলের খেত। একসময় এসব জমিতে প্রচুর ফসল ফলতো। পচা পানির কারণে এখন ফসলের উত্পাদন কমে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা বলেন, ‘পচা পানি খেতে দেওনে আলীর ( চারার ) গোড়া মোডা অইয়া যায়। ফলন অয় না। আগে এই বিশাল এলাকার দুই-তিন ফসলি জমিন এহন এক ফসলি অইয়া গেছে।’ নদের আশপাশের এলাকাগুলোতে অগভীর নলকূপ একেবারেই নেই। পানি থেকে কটু গন্ধ আসার কারণে সবাই নলকূপ ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। নাসিরাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্য ৬টি পাম্প বসানো হয়েছে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে। এ পানির জন্যও এলাকাবাসীকে অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিদিন সকালে ৩ ঘণ্টা, আবার বিকালে ৩ ঘণ্টা পানি সাপ্লাই দেওয়া হয় বলে তাঁরা জানান। পানির জন্য মাথাপিছু দিতে হয় ৪০ টাকা করে। ত্রিমহনী এলাকার ট্রলার মাঝি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে বালু গাঙ্গের পানি হগলতে খাইতো। অহন পানিত আতও (হাত) দেওয়ন যায় না। আত দিলেই চুলকানি শুরু অয়।’ বালু নদের তীরঘেঁষে রয়েছে তিনটি জেলে পল্লি। দাসেরকান্দি, চরচনপাড়া ও ফকিরখালীর দেড়শতাধিক জেলে পরিবার এখন নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বছরের ৬ মাস তাদের কাটাতে হয় অর্ধাহারে-অনাহারে। আর এর অন্যতম কারণ বালু নদের পচা পানি। পচা পানির কারণে নদে এখন মাছ নেই। উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা মকসেদুর রহমান বলেন, বালু নদের পানি এখন বিষে পরিণত হয়েছে। কোনো প্রাণীই এতে বাঁচে না। দূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে দখলের প্রতিযোগিতাও। দখলদাররা বালু নদ দখলে নিতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। নদীপাড়ে বাশের খুঁটি পুঁতে, গাছের ডালপালা দিয়ে ছোপ (ঘের) ফেলা হয়। মূলত বোঝানো হয় এখানে মাছ আটকানো হবে। পরে ধীরে ধীরে ঐ ছোপের জায়গায় বালু ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়। বালু নদের ডেমরা থেকে তুরাগের মোহনা পর্যন্ত দু’তীরে প্রায় ১৬০টির মতো ছোপ রয়েছে বলে জানা যায়। এসব ছোপ নদীপাড়ের প্রভাবশালীদের দখলেই রয়েছে। বালু নদের দু’তীরে ঘুরে দেখা যায়, শিল্পকারখানার মালিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদীর দু’পাড় অবৈধভাবে দখল নিয়ে বালু ভরাট করেছে। আবার কেউ কেউ শিল্পকারখানা, স্থাপনা, বাড়িঘর, দোকানপাট এমনকি পাকা টয়লেটও নির্মাণ করেছে। নদীতে সরকারিভাবে সীমানা নির্ধারণ করা থাকলেও একে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, বালু নদের পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। তবে পচা পানি দূর করতে হলে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের প্রয়োজন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনা ছাড়া পচা পানি রোধ করা সম্ভব নয়। ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, বালু, নড়াই ও দেবধোলাই নদের দু’ধারের ৫০ গ্রাম বাঁচাতে আট শ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল শোধনাগার নির্মাণ করার কথা রয়েছে। বালু নদীর পচা পানি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এলাকাবাসী আন্দোলন করেছেন। ঢাকা শহরের পয়োবর্জ্য বালু নদীতে পড়ে পানি দূষিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে ওয়াসার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সর্বগ্রাসী এ দূষণ বন্ধ না হলে বিশাল জনগোষ্ঠী হুমকির মধ্যে পড়বে। ঢাকা