শিশুদের স্কুলমুখী করার নানা রকম সরকারি পরিকল্পনা সত্ত্বেও প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্কুলের গমনোপযোগী ৫৬ লাখ শিশু এখনো স্কুলের বাইরে। এ শিশুদের একাংশ জীবনে কখনো স্কুলে যায়নি এবং অন্য অংশ স্কুলে ভর্তি হলেও ঝরে পড়েছে। বাংলাদেশে স্কুলের বাইরে থাকা শিশুর হার ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি তবে পাকিস্তানের চেয়ে কম। ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোর এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। শিশু শিক্ষায় বেশ কিছু তাত্পর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সামপ্রতিক বছরগুলোতে। মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। ছাত্র বৃত্তি বাড়ানো হয়েছে ব্যাপকভাবে। তারপরও দেশের ৫৬ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে থাকা নিঃসন্দেহে জাতীয় লজ্জার ঘটনা। প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে ৫৬ লাখই স্কুলের বাইরে। সোজা কথায় স্কুলে যাওয়ার বয়সী ১৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু বাইরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় এই হার ৫ দশমিক ৭ ও ৩ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতিবেদন মতে, প্রাক প্রাথমিক স্তরেও অনেক শিশু স্কুলে যায় না। বাংলাদেশে এই হার ৩৪ শতাংশ। প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে না যাওয়া শিশুরাই প্রাথমিকে ঝরে পড়ে বেশি। ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোর এ জরিপের সঙ্গে সরকারি তথ্যের অবশ্য অমিল রয়েছে। সরকারি হিসাবে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে উপযুক্ত প্রায় শতভাগ শিশুই স্কুলে ভর্তি হয়। ঝরে পড়ার হার ২৮ শতাংশ। এই ঝরে পড়া শিশুদের সঙ্গে নিম্ন মাধ্যমিকে ভর্তি না হওয়া শিশু এবং নিম্ন মাধ্যমিকে ঝরে পড়া শিশু যুক্ত হয়ে সংখ্যাটি কী দাঁড়ায়, তা অবশ্য সরকারের কাছে নেই। শিশুদের এই উল্লেখযোগ্য অংশকে স্কুলে পাঠানো ও শিক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব। কেননা এদের শিক্ষাহীনতার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো জাতির ওপর, নিশ্চয়ই তা কখনোই কাম্য হতে পারে না। আমরা মনে করি, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য দূরীকরণ একটি প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে। আর তার জন্য সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট যে শিশুদের শিক্ষা বঞ্চিত হওয়ার পেছনে আর্থিক অনটন যেমন আছে তেমনি বাল্যবিয়ে, কুসংস্কারসহ নানা ধরনের সমস্যাও বিদ্যমান। এছাড়া অভাবের দায়ে আইনগত বিধিনিষেধ থাকার পরেও শিশুশ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়। ফলে তারা স্কুলে না গিয়ে জীবিকার তাগিদে ভারী ভারী কাজ করছে একরকম বাধ্য হয়েই। কাজেই বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে এসব সমস্যার সমাধান ও ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
শিশুদের শিক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের আরো বেশি দৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। কেননা আজ যারা শিক্ষাবঞ্চিত হবে একদিন তারাই দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। এমনকি যদি দেশে শিক্ষার হার আশানুরূপ না হয় এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অংশই বঞ্চিত থাকে, তবে তার দায় সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। সবার সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারের যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপেই শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত হবে।
ঢাকা
