নিখোঁজ হওয়ার পর চার দিন কেটে গেলেও সন্ধান মিলল না মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের নিখোঁজ বিমানটির। গতকাল মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যাত্রা শুরু করার কিছু ক্ষণের মধ্যেই এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে সমস্ত সংযোগ হারানো বিমানটি শেষ মুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন করেছিল। তাদের দাবি, সংযোগ হারানোর ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় পর বিমানটি মালাক্কা প্রণালীর দিকে উড়ে যায়। এদিকে বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার পেছনে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বলে যে সন্দেহ করা হয়েছিল সেটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল। কেউ কেউ আবার ধারণা করছেন, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা চালকের ভুলের কারণেও বিমানটি বিধ্বস্ত হতে পারে। বিমানটির অনুসন্ধানে এলাকা বাড়িয়েছে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া চীন অনুসন্ধানে দক্ষিণ চীন সাগরে ১০টি স্যাটেলাইট মোতায়েন করেছে। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও সিএনএন’র।
মায়েশিয়ার এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় শহর কোটা ভারু এবং ভিয়েতনামের দক্ষিণ প্রান্তের মাঝামাঝি জায়গায় বিমানটি কিছুটা নীচে নেমে আসে এবং মালাক্কার দিকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। মালয়েশিয়ার পশ্চিম উপকূলের মালাক্কা প্রণালী জলপথ হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম জায়গা। পূর্ব উপকূলের যে জায়গায় বিমান নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে সর্বশেষ বিমানটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল সেখান থেকে এ প্রণালী অনেক দূরের পথ। নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর এই প্রথম বিমানের অবসস্থান সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া গেল।
সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, সেনাবাহিনীর র্যাডারে শনিবার রাত পৌনে তিনটে নাগাদ ওই বিমানটির অবস্থান দেখাচ্ছে মলাক্কা প্রণালীর পুলাও পেরাক দ্বীপের কাছাকাছি। সেনাবাহিনীর দেওয়া এই তথ্য যাচাই করবে বেসামরিক বিমান পরিবহন দফতর। তার পর সন্ধানকারী এবং উদ্ধারকারী দল পাঠানো হবে মলাক্কা প্রণালীর ওই অংশে। কিন্তু ওই কর্মকর্তা যে সময়ের কথা বলছেন তার প্রায় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট আগে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে বিমানটির সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কাজেই বিমান উধাও রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। অন্য দিকে যে দু’জন ভুয়ো পাসপোর্ট নিয়ে ওই বিমানে চেপেছিলেন, সেই দুই যাত্রীর ছবি এ দিন প্রকাশ করেছে ইন্টারপোল। তারা ইরানের বাসিন্দা। মালয়েশিয়ার পুলিশ প্রধান আলিদ আবু বাকার বলেন, ইরানি এই যুবক কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য নন। মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ জার্মানিতে বসবাসরত ওই যুবকের মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ছেলের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। কুয়ালালামপুরে বসবাসরত এক ইরানি যুবক নিজেকে মেহেরদাদের স্কুলজীবনের বন্ধু দাবি করে জানিয়েছেন, তাঁর বন্ধু ও চোরাই পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করা আরেক ইরানি যাত্রার আগে তাঁর বাসাতেই ছিলেন। তাঁরা ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাস করার চেষ্টা করছিলেন। এছাড়া থাইল্যান্ড থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, একজন ইরানি মধ্যস্থতাকারীর সহযোগিতায় থাই ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে ওই দু’জন মালয়েশিয়া থেকে বেইজিং হয়ে আমস্টারডাম যাওয়ার টিকিট কেটেছিলেন। শনিবার ভোররাতে কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাওয়ার পথে ২৩৯ জন আরোহীসহ নিখোঁজ মালয়শিয়ান এরালাইন্সের বিমানটি ইতোমধ্যেই নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
নিখোঁজ বিমানের খোঁজে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি জাহাজ এবং ৩৪টি বিমান তত্পর রয়েছে। অভিযানে আছে যক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরও। তবে বিমানের খোঁজ পাওয়ার কোনো সুস্পষ্ট দাবি সামরিক বাহিনী এখনো করেনি। ইতোপূর্বে বিমানটি সন্ত্রাসী হামলা কিংবা ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে কিনা এমন প্রশ্ন উঠলেও এর পক্ষে জোরালো কোনো যুক্তি বা প্রমাণ পায়নি উদ্ধারকাজে নিয়োজিত বহুজাতিক সংস্থাগুলো। মালয়শিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে আকাশে ওড়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই যাত্রীবাহী বিমানটি রাডার যোগাযোগের বাইরে চলে যায়। এই সময়ের মধ্যে বিমানটি ভিয়েতনামের কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা বলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে। কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংগামী নিখোঁজ মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানটি খুঁজতে আরো বড় এলাকাজুড়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষ। চীন সরকার মালয়েশিয়ার প্রতি আরো জোর অনুসন্ধান চালানোর আহবান জানিয়েছে। নিখোঁজ বিমানটির অধিকাংশ যাত্রী ছিল চীনা নাগরিক। নিখোঁজদের স্বজনদের অনেকেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন বলে মনে হচ্ছে। মালয়েশিয়া এই স্বজনদের কুয়ালালামপুরে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দিয়েছে যাতে তারা আরো কাছ থেকে উদ্ধারকার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারে।
