গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হইলে সহিংসতা হ্রাস পাইবে

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৪, ২০:৪৬
সমপ্রতি দ্বিতীয় দফায় উপজেলা নির্বাচনের সময় দেশে নির্বাচনী সহিংসতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে বলা হইয়াছে যে, নির্বাচনে সহিংসতার সংস্কৃতি পুনরায় ফিরিয়া আসিতেছে। কয়েকদিন আগে গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটিয়াছে। একজন নিহতও হইয়াছেন। সহিংসতার জের ধরিয়া পিছাইয়া গিয়াছে এই উপজেলার নির্বাচন। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধম ধাপের উপজেলা নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হইলেও গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়াছে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। সহিংসতায় নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে একজন নিহতসহ বিভিন্ন জেলায় আহত হইয়াছেন শতাধিক ব্যক্তি। নির্বাচন কমিশন কিছু কিছু ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইয়াছে। তবে কোথাও কোথাও নিশ্চুপ থাকিবারও অভিযোগ রহিয়াছে। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার একে-অপরের পরিপূরক। নির্বাচনের মধ্য দিয়াই জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। তাহারপরও বাস্তবতা হইল নির্বাচন কখনও কখনও হইয়া উঠে সহিংস। তাহার কারণ একটু গভীরে ভাবিয়া দেখিলে আমরা স্পষ্টত বুঝিতে পারি—গণতন্ত্র নামের হিতকারী বৃক্ষটি ভিনদেশ হইতে আমদানি করা। সেই বৃক্ষের কিছু পরগাছা বা আগাছা আছে। গণতন্ত্রের সেই পরগাছা বা আগাছাও রোপিত হইয়াছে আমাদের জমিনে। তাহা নিয়মিত পরিচর্যা করা দরকার। পরিচর্যার চেষ্টা যেমন আছে, তেমনই খামতিও রহিয়াছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। ইহা কেবল উপমহাদেশীয় সমস্যা নহে, ইহা তৃতীয় বিশ্বের একটি সমস্যা। এইখানে যে গণতন্ত্র শিকড় বিস্তৃতির চেষ্টা করিতেছে তাহাই অনেক বড়। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ হইবার পরও ভারতে যেমন গণতন্ত্র মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতেছে, ক্রমশ মহীরূহ হইয়া উঠিতেছে, তেমনি গণতন্ত্রের আগাছা তথা সহিংসতাও সেইখানে বিরলদৃষ্ট নহে। বরং সেইখানেও নির্বাচনকালে বোমাবৃষ্টি, গুলিচালনা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, নারীনির্যাতন, নরহত্যা ব্যাপকভাবেই সংঘটিত হয়। এইসব লইয়া তির্যক চলচ্চিত্র ও সাহিত্যও রচনা হয় এন্তার। এই তো গত বত্সর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে যে পঞ্চায়েত নির্বাচন সম্পন্ন হইল, তাহাতে হিংসায় বলি হইয়াছে প্রায় অর্ধশত প্রাণ। সেইখানকার পত্রপত্রিকা বলিতেছে, ফি বত্সর নির্বাচনের সহিত হিংসার পরিধি বাড়িতেছে। সেইখানে স্থানে স্থানে ভোট পণ্ড হইয়াছে। তাহার পরও মানুষ ভোট দিয়াছে স্বত:স্ফূর্তভাবে। প্রশ্ন হইল, নির্বাচনী সহিংসতার পথ কখন গ্রহণ করা হয়? কারা গ্রহণ করেন? ইহার উত্তর খুঁজিতে গত জানুয়ারিতে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত হইয়াছিল ‘হোয়াট মেকস সাম ইলেকশনস ভায়োলেন্স?’ নামের একটি প্রবন্ধ। সান ডিয়েগো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এমিলি এম. হ্যাফনার-বার্টন, ইয়েল ইউনিভার্সিটির সুসান ডি. হাইড এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সাইন্সের রাইয়ান জ্যাব্লনস্কি নামের দুই গবেষক এই প্রবন্ধে জানান, যখন কেউ ক্ষমতা হারাইবার ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করেন কিংবা পাইবার ব্যাপারে মরিয়া হন তখন সহিংসতা মাথাচাড়া দিতে পারে। তাহাছাড়া, শাসন প্রণালীতে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতায় সহিংসতা করিয়া পার পাইয়া যাইবার সুযোগ থাকিলে হিংসা আরও বাড়িয়া যায়। তবে আপাত হিংসা বা সহিংসতায় গণতন্ত্র বিপন্ন হয় না। ইহা রাতারাতি দূর হইবারও নহে। বিশ্বের যেইসব দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অধিক শক্তিশালী হইয়াছে, নির্বাচনী সহিংসতাও সেইখানে স্বাভাবিকভাবে কমিয়া আসিয়াছে। কেননা গণতন্ত্র শক্তিশালী হইলে, নির্বাচনে কোনো একটি পক্ষের অনুকূল ফলাফল নিশ্চিত করিতে যে নির্বাচনী সহিংসতার তত্পরতা দেখা যায়, তাহা সম্ভব হয় না। তাহাছাড়া বিরোধীপক্ষই যে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। মানুষে-মানুষে, গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে, স্বার্থে-স্বার্থে যে সংঘাত, রাজনৈতিক বিরোধিতার মাধ্যমে তাহার মোকাবিলাই গণতন্ত্রের পদ্ধতি। এইভাবেই গণতন্ত্র সকল গোষ্ঠী, মতকে স্থান দিতে পারে। গণতন্ত্র মানে যে শুধু ক্ষমতা নহে, তাহা উপলব্ধি করাটাও গণতন্ত্রের জন্য জরুরি বটে।