খোদ রাজধানীতে অবৈধ ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে মৃত্যুর পথযাত্রী ক্যান্সার রোগীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে ১৫ বছর ধরে। মহাখালী ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের সামনে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছেই চিকিত্সার নামে এ মানুষ মারার হাসপাতাল। এ হাসপাতালের মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কেরানি ও ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের এক ওয়ার্ড বয়। চিকিত্সক হিসেবে রয়েছেন এক মহিলা, এক যুবক এবং ঝাড়ুদার। তারা শুধু ইনজেকশন দেয়া ব্যতীত চিকিত্সা বিজ্ঞানের কোনো কিছুই জানে না। এমনকি তাদের কোনো সাধারণ লেখাপড়াও নেই। মাত্র অষ্টম থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা। মহাখালী সরকারি ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের সামনে খাবার হোটেলের ছাদে টিনশেডের তৈরি ১৮ বেডের ক্যান্সার হাসপাতাল। প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও নার্স ছাড়া তারাই ১৫ বছর ধরে চিকিত্সা সেবা দিয়ে আসছে।
গতকাল বুধবার র্যাব-১ এর উপপরিচালক মেজর মো. আসিফ কুদ্দুস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ডা. যোগেশ চন্দ্র রায় এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট ওই হাসপাতালে অভিযান চালান। এসময় ১২ জন ক্যান্সার রোগী চিকিত্সাধীন ছিলেন। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ছেড়া বিছানাপত্র ও তেলাপোকায় কিলবিল করছে হাসপাতাল। এর মধ্যেই শুয়ে আছেন রোগীরা। এ পরিবেশ দেখে মোবাইল কোর্ট নিজেই বিস্মিত হন। ওই সময় বিউটি বেগম (৩৮) কবির হোসেন নামের একজন রোগীর দেহে ক্যামো-ইনজেকশন দিচ্ছিলেন। তার সহযোগী ছিলেন শাহাদাত হোসেন (২৪)। বিউটি বেগম মোবাইল কোর্টকে জানান, তিনিই এখানকার রোগীদের ক্যামো-ইনজেকশন, রক্ত ও স্যালাইন পুশসহ চিকিত্সা দিয়ে থাকেন। চিশতিয়া খাবার হোটেলের একতলা ভবনের ছাদে টিনশেড দিয়ে ১৮ বেডের এ হাসপাতাল। হার্ডবোড দিয়ে দুই বেডের ৫টি ক্যাবিনও করা হয়েছে। প্রতিটি বেডের ভাড়া দৈনিক ৩০০ টাকা এবং ক্যাবিনের প্রতি বেডের ভাড়া ৫০০ টাকা। ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে আগত রোগীদের নানা কৌশলে দালালের মাধ্যমে ভাগিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়। কোনো কোনো রোগী এখানে এক বছর পর্যন্ত চিকিত্সাধীন থাকেন। লাখ লাখ টাকা তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে কিংবা অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বেশিরভাগ রোগীই ধীরে ধীরে মারা যান বলে বিউটি বেগম মোবাইল কোর্টকে জানান।
রোগী আবুল হাশেম জানান, তিনি ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে ভর্তি হতে এসেছিলেন। তাকে এক দালাল ফুসলিয়ে এখানে নিয়ে আসে। বিউটি বেগম ও শাহাদাত হোসেনকে মোবাইল কোর্ট দুই বছরের করে কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিনমাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলখানায় পাঠিয়ে দেন। বিউটি বেগম মোবাইল কোর্টকে জানান, তিনি শুধু এখানে চাকরি করেন। এ হাসপাতালের মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেরানি লায়াল হাসান ও ক্যান্সার ইন্সটিউটের ওয়ার্ড বয় শেখ মাহবুবুল আলম। মোবাইল কোর্ট এ দুই মালিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। চিকিত্সাধীন রোগীদের ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে স্থানান্তর করেন মোবাইল কোর্ট। এ অবৈধ হাসপাতালটি সিলগালা করে দেয়।
মহাখালী ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, এ অবৈধ হাসপাতাল সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কয়েক দফা জানানো হয়েছে। কোনো সাড়া মেলেনি। ওই এলাকায় আরও দুটি অবৈধ ক্যান্সার হাসপাতাল রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হক বলেন, সরকারি হাসপাতালের সামনে ও আশেপাশে এ ধরনের অবৈধ কিংবা নিম্নমানের ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম নির্দেশনা দেন। এরই অংশ হিসেবে মহাখালীসহ সারাদেশে অভিযান চলছে। জড়িত কেরানি ও ওয়ার্ড বয়ের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
