‘সারা বিশ্বের নাট্যচর্চা সম্পর্কে অভিনেতার আগ্রহ থাকতে হবে’

আপডেট : ২২ মে ২০১৯, ২০:০১

 

স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই শাস্ত্রীয় নৃত্য শেখার উদ্দেশ্যে নৃত্যগুরুর শরণাপন্ন হয়েছিলেন রুবায়া জাবিন প্রিয়তা। ওই সময় জাগরণ খেলাঘর আসরের সঙ্গে যুক্ত হোন তিনি। এরপর ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী থাকাকালীন নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জের থিয়েটার দল থিয়েটার সার্কেলের সঙ্গে যুক্ত হোন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন তিনি। গুণী এই অভিনেত্রীর সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মাহবুব আলম

 

একজন অভিনেতার প্রধান কী কী গুণ থাকা উচিত বলে মনে করেন?

অভিনেতার সৃষ্টিশীল স্বাতন্ত্র্য, কল্পনা, গভীর মনোনিবেশ, ভালো-মন্দের প্রভেদ করার ক্ষমতা বা উপলব্ধি থাকতে হবে। অভিনেতাকে প্রচুর পরিশ্রমী হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমি শুধু মেধায় বিশ্বাসী নই, পরিশ্রমে বিশ্বাসী। অভিনেতার অভিনয় বিষয়ক জ্ঞান অর্জনের জন্য ব্রত থাকা প্রয়োজন। শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। অভিনেতাকে অনেক বেশি মনোযোগী হতে হবে। যে অভিনেতা যত বেশি মনোনিবেশ করতে পারবেন তাঁর কাজের ওপর, তিনি দর্শকদের ওপর ততই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবেন। তাকে নিঃসন্দিহান থাকতে হবে যে, মঞ্চে তিনি যা করছেন, তা তিনি জেনে বুঝে করছেন। সারা বিশ্বের নাট্যচর্চা সম্পর্কে অভিনেতার আগ্রহ থাকতে হবে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—নাট্যশিক্ষা নাকি অভিজ্ঞতা?

অভিনয়ের ক্ষেত্রে দুটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। শুধুই নাট্যশিক্ষা নিয়ে অভিজ্ঞতাহীনভাবে কিছু করা যায় না।পক্ষান্তরে নাটক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন না করে ভালো নাটক করা সম্ভব না, এটাও ঠিক না। বাংলাদেশে যাঁরা প্রখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যতাত্ত্বিক আছেন, তাঁরা সবাই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নাটক বিষয়ে যথেষ্ট পঠন পাঠন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ :গোলাম মুস্তাফা, আব্দুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশীদ, শিমুল ইউসুফ, হুমায়ুন ফরিদীসহ আরো অনেক শ্রদ্ধেয় নাট্যজন। তাঁরা সবাই একাডেমিশিয়ান না হয়েও অভিনয় সম্পর্কিত প্রচুর জ্ঞান অর্জন করেছেন। আমাদের দেশে মঞ্চ নাটকের শুরুর কাল থেকে যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁরা অনেকেই বিলেত কিংবা কলকাতা নাটকের অনুকরণে নাট্যচর্চা করেছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নাট্যশিক্ষা এবং সেলিম আল দীন পরবর্তী সময়ে নাট্যচর্চায় নাটক বিষয়ক জ্ঞান অর্জন জরুরি বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং থিয়েটারে অভিনয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়ক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

বাংলা মঞ্চ নাটক এখন কোন ধারায় প্রবাহিত বলে মনে করেন?

আমার মনে হয়, বাংলা মঞ্চ নাটক একটি মিশ্র রীতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। একদিকে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের হয়ে কিছু নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা বাংলা নাটকের চর্চা করছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় নাট্যরীতিকে আদর্শ ভেবে কিছু নির্দেশক, অভিনেতা এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এ দুই ধারার সংশ্লেষে মিশ্ররীতির মাধ্যমে নাট্য প্রয়োগে ব্যাপৃত রয়েছেন। সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, মিশ্র রীতির প্রয়োগের চর্চাটা বেশি। যেখানে নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল কাজ প্রতিনিয়তই বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে আমরা দেখতে পাই। যা বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে ইতিবাচক বলে আমি মনে করি। মঞ্চস্থ নাটকগুলো দেশে ও দেশের বাইরে নানা উত্সব-আয়োজনকে কেন্দ্র করে অভিনীত হচ্ছে এবং সর্বজন গ্রাহ্যতা অর্জন করেছে। এটা আমাদের নাটকের ভালো দিক বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশের নাট্যকলা বিভাগগুলোর মধ্যে পাঠ্যসূচির সমন্বয় কতটা জরুরি এবং তার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

প্রতিটি বিভাগের কিছু লক্ষ্য থাকে। সেই বিভাগ তা পূরণে এগিয়ে যায়। কোনো বিভাগের উদ্দেশ্য থাকতে পারে নাট্য বিষয়ক ভালো গবেষক তৈরি করা। কোনো বিভাগ ভালো প্র্যাকটিশনার তৈরি করতে চায় অথবা কোনো বিভাগ খুব ভালো অ্যাকাডেমিশিয়ান চায়। এসব লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়। ফলে একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগগুলোর পাঠ্যসূচির কিছু পার্থক্য রয়েছে। এরূপ হওয়াটাকে আমি ইতিবাচক বলেই মনে করি। তাতে একই বিষয়ের বিভিন্ন দিকে দক্ষ শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে।