দুই বছর বয়সে বাবা-মাকে হারান পর্তুগালের মারিয়া ডি কনন্সিকো। ঠিকানা হল বস্তিতে। অনাহারে-অর্ধাহারে সেখানেই দিন কাটছিল তার। অসহায় ওই শিশুটির দিকে হঠাত্ মুখ তুলে তাকাল ভাগ্যদেবী। ছোট্ট মারিয়াকে দত্তক নিলেন আরেক মারিয়া। মারিয়া ক্রিস্টিয়ানা। তিনি মেয়েটিকে নিজের সন্তানের মত পেলেপুষে বড় করতে লাগলেন।
সেইদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটির বয়স এখন ৩৭। এতো বছরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শুধু বদলায়নি একটি জায়গায়। তা হল বস্তিবাসী অনাথ শিশুদের সত্যিকারের মানুষ করার মারিয়ার প্রত্যয়ে। প্রতিদিন তিনি স্বপ্ন দেখতেন, তার মত আর কাউকে যেন বস্তিতে নিরাপত্তাহীন জীবন যাপন করতে না হয়। কাউকে যেন না খেয়ে থাকতে হয়, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হতে হয়। এই মানস থেকেই লড়ছেন মারিয়া। শিশুদের জন্য তহবিল সংগ্রহে ইতিমধ্যে প্রথম পর্তুগিজ নারী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন তিনি। অংশ নেন দশ লাখ ডলারের তহবিল সংগ্রহে সাত সপ্তাহে সাত মহাদেশে ম্যারাথন দৌড়ে।
গতকাল শনিবার ধানমন্ডির দৃক গ্যালারিতে সাংবাদিক সম্মেলন করেন মারিয়া। জানান, শিশুদের নিয়ে স্বপ্ন ও তাদের সুপ্ত প্রতিভার কথা।
তিনি বলেন, এ বছরের জানুয়ারিতে তিনি অ্যান্টার্কটিকা থেকে শুরু করেন ম্যারাথন দৌড়। পরে পর্যায়ক্রমে দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর আমেরিকা হয়ে আফ্রিকায় গিয়ে শেষ করেন তার ম্যারাথন দৌড়।
৮ মার্চ যখন তিনি ম্যারাথন শেষ করেন ততক্ষণে দ্বিতীয় বারের মত গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ওঠে যায় তার নাম। একে ৭৭৭ আলট্রা ম্যারাথনও বলা হয়। মারিয়া বিশ্বের অন্যতম কঠিন ও লম্বা ৫০ কিলোমিটার আল্ট্রা ম্যারাথনের জন্য কঠিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
শিশুদের জন্য কাজ করবেন বলে বিয়ে করেননি মারিয়া। বাংলাদেশের প্রায় ছয়শ’ বস্তির শিশু এখন বড় হচ্ছে মারিয়ায় মাতৃস্নেহে। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, আমি ওদের মানসম্পন্ন জীবন দিতে চাই, যাতে ওরা ভাল মানুষ হয়। ওদেরকে ভালভাবে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে চাই আমি, যেটা আমার মা আমাকে দিয়েছিলেন। আমার মায়ের ছয় ছয়টি সন্তান থাকার পরও তিনি আমাকে কখনো আলাদা ভাবেননি। মারিয়ার সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে ছিলেন শিউলি, করিমসহ আরও অনেক অনাথ শিশু। তারাও স্বপ্ন দেখছেন মানুষের মত মানুষ হবে। শিউলির এখন বয়স ১৫। পাঁচ বছর আগে তাকে দক্ষিণখানের একটি বস্তি থেকে পড়াশোনার জন্য নিজের কাছে নিয়ে আসেন মারিয়া। শিউলি এখন স্ট্যার্টান্ড নাইনে পড়াশোনা করছে। তার স্ব্বপ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। মারিয়া নিজে বিমানবালা হওয়ায় তিনি চান এই শিশুদের মধ্য থেকেও কেউ এই পেশায় আসুক। শুধু পড়াশোনাই নয়, বস্তির এই শিশুদের নানা রকম প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে বড় করছেন তিনি।
অনাথ শিশুদের আলো দেখাতে বাংলাদেশকে কেন বেছে নিলেন এমন প্রশ্নে মাারিয়া বলেন, বাংলাদেশই আমাকে বেছে নিয়েছে। আমি যখন প্রথম বাংলাদেশে আসি, তখন বস্তির এই শিশুদের মাঝে আমি আমার পুরনো অতীতকে দেখতে পাই।
২০০৫ সালে দুবাইয়ে তিনি ‘মারিয়া ক্রিস্টিনা ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই ৬ শ’ শিশু এখন সেখানেই পড়াশোনা করছে। তাদের জন্যই তার নানা ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ। এর মধ্যে রয়েছে লন্ডন এবং দুবাইয়ে ম্যারাথনে অংশগ্রহণসহ, কিলিমানজারো শৃঙ্গ জয়, উত্তরমেরু অভিযান এবং সাত মহাদেশে পরপর সাতদিনে সাতটি ম্যারাথনে অংশ নেয়া। মারিয়াকে সহযোগিতায় তার দাতব্য সংস্থা থেকে অনেক অবস্থাসম্পন্ন দম্পত্তি শিশুদের দত্তক নেন। মারিয়া ডি কনন্সিকো ২০০৩ সালে এমিরেটাস এয়ারলাইন্সের একজন বিমানবালা হিসেবে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। তার মানবহিতৈষী কাজের জন্য পেয়েছেন নানা পুরস্কার-স্বীকৃতি। হয়েছেন পর্তুগালের বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব। সাস্টেইনেবল লিডার শিপ অ্যাওয়ার্ড, গ্রেট চাইল্ড ওয়েল ফেয়ার অ্যাওয়ার্ডসহ পেয়েছেন সম্মানজনক পুরস্কার।
ভবিষ্যতের কথা জানতে চাইলে একগাল হেসে মারিয়া বলেন, ওদের সুন্দর ভবিষ্যতই আমার ভবিষ্যত। তিনি বলেন, আপনারা আমাকে একটি টাকাও দেবেন না। শুধু ওই শিশুদের সহযোগিতা করুন। বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে মারিয়া ক্রিস্টিয়ানা ফাউন্ডেশনে সহযোগিতা করা যাবে।-www.mariacristinaFoundation.org অথবা facebook ও তার সম্পর্কে তথ্য জানা যাবে।
