সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির নির্বাচনে সবসময়ই সরকারপন্থীরা হেরে যায়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তার প্রতিপক্ষরা নির্বাচনে বিজয়ী হয়। দুই-একবার ব্যতিক্রম হলেও সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের শাসনামল থেকে এ ধারা চলে আসছে। তবে কোন প্যানেলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের ঘটনা খুব কমই রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির এবারের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব ও কলহ -এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আইনজীবীরা।
গত বছর অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে সমন্বয় পরিষদ থেকে প্রথমে দুইটি প্যানেল দেয়া হয়। যদিও ঐক্যের খাতিরে এডভোকেট আব্দুল মতিন খসরুর নেতৃত্বাধীন প্যানেল শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। এবার শুরু থেকেই সমন্বয় পরিষদের একটি প্যানেলই মাঠে নামে। বর্তমানে ৫টি আইনজীবী সংগঠন আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ, জাতীয় আইনজীবী পরিষদ, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি, জাতীয় আইনজীবী ফেডারেশন নিয়ে সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ গঠিত। কিন্তু নির্বাচনে সমন্বয় পরিষদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিলো। শুধু প্রচারপ্রচারণায় সমন্বয়হীনতাই নয় ৫০টিরও বেশি ব্যালটে দেখা গেছে সভাপতি ও সম্পাদকদের বাদ দিয়ে সমিতির কার্যনির্বাহী অন্যান্য পদে ভোট দেয়া হয়েছে। এতে ধারণা করা যায়, গোপনে ৫০ জনের মত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ও সম্পাদককে হারানোর জন্য একাট্টা হয়েছিলেন। এছাড়া সমন্বয় পরিষদের মূল নেতা ড. কামাল হোসেন নিষ্ক্রিয় ছিলেন। অপর নেতা ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম অসুস্থ রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট বারে আইনজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছেন ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। টানা তিনবার বিএনপি পন্থি প্যানেল বিজয়ী হওয়ার পর বারের নির্বাচনে সমন্বয় পরিষদের সভাপতি পদে পরিবর্তন আনা হয়। এর নেতৃত্ব দেন ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। তার নেতৃত্বে বেশ কয়েকবার সমন্বয় পরিষদ বিজয়লাভ করে। এমনকি দুইবার বার কাউন্সিলের নির্বাচনেও বিপুল বিজয় অর্জন করে সমন্বয় পরিষদ। কিন্তু নানা কারণে তিনি আগের মত সক্রিয় নন। পরপর দুইবার হেরে যাওয়ায় এডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদারও এবার সক্রিয় ছিলেন না। বিগত (২০১১-২০১২) নির্বাচনে এডভোকেট মোমতাজউদ্দীন মেহেদী সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু গতবার এবং এবার তিনি প্রার্থী হওয়ার জন্য অনড় থাকলেও তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। তিনি এবং তার সমর্থকরাও নির্বাচনে সক্রিয় ছিলেন না।
সুপ্রিম কোর্ট বারের বিগত কয়েকটি নির্বাচনের মধ্যে দুইটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী প্যানেল সভাপতি ও সম্পাদকসহ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। একটি নির্বাচনে সভাপতি পদে বিএনপি সমর্থিত ও সম্পাদক পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল বিজয়ী হয়। এবারের নির্বাচনে সভাপতি ও সম্পাদকসহ ১৩টি কার্যনির্বাহী পদে জয়লাভ করে সরকার বিরোধী আইনজীবীরা। শুধু একটি সদস্য পদ লাভ করে সরকার সমর্থক আইনজীবী প্যানেল। এছাড়া গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনেও বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে সরকার সমর্থক আইনজীবীরা। ওই নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। সমন্বয় পরিষদের দ্বিধাবিভক্তির কারণে বার কাউন্সিলের নির্বাচনেও তারা হেরে যায়। কিন্তু বার কাউন্সিলের নির্বাচিত নেতৃত্ব যাতে কাজ করতে না পারে সেজন্য আইন করে নির্বাচিত নেতৃত্বের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়। এতেও আইনজীবীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়।
সরকার পন্থীরা কেন হারে
সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে সরকার সমর্থক আইনজীবী প্যানেলের ভরাডুবির পেছনে নানা কারণ রয়েছে বলে মনে করেন সাধারণ আইনজীবীরা। তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, দশম সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী নেতাদের গ্রেফতার ও পুলিশী রিমান্ডে নেয়া, বিচারপতি ও এটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব ও দলীয় আধিপত্য, সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের উপর বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলা ও সমন্বয় পরিষদের নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতৃত্বে বিরোধীরা থাকলে তারা সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করে থাকেন। এই সমালোচনার কারণে অনেক সময় আইনজীবী নেতাদেরকে পুলিশী হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। যা সাধারণ আইনজীবী ভালোভাবে নেননি। এছাড়া গত ২৯ ডিসেম্বর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোটের ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে ঢুকে আইনজীবীদের উপর হামলা করে বহিরাগতরা। ওই হামলায় বেশ কয়েকজন নারী আইনজীবী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশ ও প্রচারিত হয়। এই হামলার ঘটনা দোষীদের গ্রেফতার ও বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানায় সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতি। কিন্তু বারের সেই দাবি আজও মানা হয়নি। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রকাশ্যে এভাবে বহিরাগতদের হামলার ঘটনায় কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় ক্ষুব্ধ হন সাধারণ আইনজীবীরা। যার প্রভাব পড়েছে নির্বাচনে।
এটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল ও সহকারী এটর্নি জেনারেল নিয়োগ নিয়েও সমন্বয় পরিষদের আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ।
