মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৪, ২০:৩১
একটি প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন করার একটি প্রক্রিয়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। এছাড়াও কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট করা, আগ্রহীদের মধ্য থেকে যোগ্যদের খুঁজে বের করা, কর্মীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের সু-সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের কর্মজীবনে উত্তরোত্তর উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজনে তাদের চাকুরিচ্যুত করাসহ প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ সম্পর্কিত সব ধরনের কাজই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজ। এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু ফয়সাল আহমেদ এফবিপি অ্যান্ড ডেপুটি হেড অব এইচ আর ডিভিশন, ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড মানুষের সাথে মেশা এবং মানুষকে জানার অদম্য আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই ছিল তার। খুব সহজেই পরিচিত বা অপরিচিত যেকোনো মানুষের সাথেই মিশে যেতে পারতেন তিনি। সেজন্য তার বন্ধুর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। সব সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা, হৈচৈ করে বেড়াতেন। বাবা ছিলেন ব্যাংকার। সকাল বেলা কেতাদুরস্ত হয়ে অফিসে যাওয়া, বিকেলে হাতে খেলনা নিয়ে ফিরে আসা, সন্তানদের নিয়ে বাকিটা সময় গল্প করা—এসবই ফয়সাল আহমেদের মনের মাঝে ব্যাংকের চাকরির প্রতি একটা সুপ্ত আকর্ষণ তৈরি করে দেয়। সে টানেই পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়াশোনা করেন ফয়সাল। ব্যাংকে চাকরি এবং মানব সম্পদ বিভাগ—এ দুটোই ছিল তার লক্ষ্য। ১৯৯৮ সালে আগস্ট মাসে ন্যাশনাল ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেন। প্রথম এক বছর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় কাজ করেন। আর এ সময় মানব সম্পদ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছেটা দিন দিন তীব্র হতে থাকে। ১৯৯৯ সালে সে সুযোগটা পেয়ে যান তিনি। খাতুনগঞ্চ থেকে বদলি হয়ে চলে আসেন ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগে। পরবর্তী ১২ বছর একগ্রতা ও অধ্যবসায় দিয়ে এই বিভাগে কাজ করেছেন তিনি। এরপর ২০১২ সালে ব্যাংক এশিয়াতে মানব সম্পদ বিভাগে যোগদান করেন। নিজের কাজ সম্পর্কে ফয়সাল বলেন, ‘আধুনিক মানব সম্পদ বিভাগের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের জন্য মানব সম্পদকে একীভূত করে সঠিক কৌশল নির্ধারণ করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানো।’ নতুন প্রজন্মের কাজ সর্ম্পকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সময়ে মানব সম্পদকে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়ার প্রচলন ছিল না। যে কারণে এ বিষয়ে পড়াশোনার গণ্ডিটাও তেমন ছিল না। বর্তমানে এ চিত্র বদলে গেছে বহুলাংশে। এখন এইচআরএম অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যতালিকাতেও আছে এবং অনেক কোর্সও চালু হয়েছে এ বিষয়ে। বর্তমানে যারা কাজ করছেন, সত্যি বলতে আমাদের চাইতেও তারা অন্তত থিউরিটিক্যালি অনেক ভালো জানেন। তাই নতুন যারা কাজ করছেন বা করতে আসছেন তাদের আমি শ্রদ্ধা করি এবং তাদের সাথে কাজ করতেও অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’ ফয়সালের শৈশব ও কৈশোর পুরোটাই কেটেছে ঢাকার দক্ষিণ গোড়ানে। কলেজ জীবনে গানের পোকা মাথায় ঢুকেছিল তার। এক সময় কিউপিড নামের একটা ব্যান্ডে কিছুদিন লিড গিটারিস্ট হিসেবে যোগ দেন এবং একটা অ্যালবামেও কাজ করেন। পরিবারে পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে ফয়সাল সবার ছোট। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই ছেলের বাবা। ভবিষ্যত্ নিয়ে খুব একটা ভাবেন না ফয়সাল। নিজের কাজটা উপভোগ করেন তাই কাজ করে যেতে চান তিনি। তবে যদি কখনও সুযোগ হয় তার ইচ্ছে আছে একটি এতিমখানা ও বৃদ্ধাশ্রম করার। ফয়সাল আহমেদ ডাক নাম :ফয়সাল জন্মতারিখ ও স্থান :২ অগাস্ট, ঢাকা মায়ের নাম :তাহমিনা বেগম বাবার নাম :কবির আহমেদ প্রথম স্কুল :আইডিয়াল হাই স্কুল, মতিঝিল প্রিয় মানুষ :বাবা প্রিয় পোশাক :জিন্স ও টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটানো। সাফল্যরে সংজ্ঞা :স্বপ্ন পূরণই সফলতা। ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ মধুবন্তী কবীর উপ পরিচালক, রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড রিমিউনারেশন, মানব সম্পদ ও প্রশাসন, বাংলালিংক এইচআর-এ এমবিএ করে যখন দেশে ফেরেন, তখন বাংলাদেশে এই বিষয়ক পেশাটি একেবারে নতুন। তাই তিনি নিজেও ঠিক জানতেন না কোথায় কীভাবে নিজেকে যুক্ত করবেন। সে সময় কর্পোরেট জগতে টেলিকমিউনিকেশনে কাজের প্রতি সবার আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। এমনই প্রেক্ষাপটে মোবাইল অপারেটর একটেলে কাজের সুযোগ পেয়ে যান মধুবন্তী কবীর। তখন থেকেই কাজ করেছেন মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায়। প্রথম প্রথম কাজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, শুরুর প্রেক্ষাপটে কারোরই ধারণা ছিল না এই ক্ষেত্রে কেমন কাজ হয়, কীভাবেই বা কর্পোরেট দুনিয়া চলে। একটেলে প্রায় চার বছর কাজ করার পর তিনি যোগ দেন বাংলালিংকে এমপ্লয়ি রিলেশনশিপ ম্যানেজার পদে। আর তারপর থেকে এই অপারেটরের সাথে পথ চলার বয়স প্রায় এক দশক হয়ে গেল তার। দীর্ঘ এই সময়ে তার সাফল্যগাথাও কম নয়। নানা সংস্কৃতির নানা মানুষের বিশাল পরিবারের হূদ্যতাকে আগলে রাখেন তিনি। একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেন? উত্তরে মধুবন্তী কবীর বলেন, ‘যেকোনো পেশাতেই শ্রম, দূরদর্শিতা আর উদ্যোগ থাকলেই সফলতা আসে। সেই সাথে ভাগ্যটাও কিছুটা সুপ্রসন্ন থাকা দরকার। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও অনেক জরুরি। এই প্রজন্মের অনেক ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও কখনও কখনও তাদের সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অস্থিরতা।’ প্রজন্মের মেধাবী এই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে প্রশ্ন ছিল, নিজেকে কর্পোরেট দুনিয়ায় কীভাবে এগিয়ে রাখা যায়? তিনি প্রথমেই বললেন, ‘কমিউনিকেশন অনেক ভালো থাকা দরকার। এর বাইরে দলগত কাজে পারদর্শিতাও অনেক জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করে আসলে সবার সম্মিলিত প্রয়াসের উপর। আর একজন সফল কর্পোরেটকে এই সবগুলো বিষয় মাথায় রেখে এগোতে হয়।’ মধুবন্তী কবীরের বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই, তবে কিছুটা সময় কেটেছে লিবিয়া ও ইংল্যান্ডে। তার বাবা ছিলেন একজন সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট এবং মা লেখালেখি করেন। মায়ের লেখা শিশুসাহিত্য শৈশবে খুব পড়া হতো। মধুবন্তীর এখন একমাত্র সন্তান নীলাদিত্যকে নিয়েই কাটে অবসরের পুরোটা সময়। উদয়ন স্কুল ও ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজ থেকে মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন তিনি। এরপরই চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি কোর্স করতে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখান থেকেই এইচআর-এ এমবিএ করে দেশে ফিরে আসেন। একজন মধুবন্তী কবীর শুধু নিজের ক্ষেত্রে নন, দেশের শীর্ষ একটি প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের প্রতিদিনের সাফল্যের পেছনের কারিগর হয়ে আছেন। তাই অজস্র শুভকামনা তার জন্য। মধুবন্তী কবির ডাক নাম :বুলা মায়ের নাম :সুনন্দা কবীর বাবার নাম :এম এ কাদের সিদ্দিকী প্রথম স্কুল :লিটল জুয়েলস কিন্ডার গার্ডেন প্রিয় মানুষ :বাবা, মা আর ছেলে প্রিয় পোশাক :শাড়ি অবসর কাটে যেভাবে :ছেলের সাথে খুনসুটি করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :মানুষের জন্য অর্থপূর্ণ কিছু করতে পারাটাই সফলতা। ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ সৈয়দ সায়াদ ইবনে রাশেদ ম্যানেজার, (এইচ আর), রহিম আফরোজ লিমিটেড (আগোরা) গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান অনেকেই, কিন্তু শেষটায় ঝুঁকির কারণে আর যাওয়া হয় না! সায়াদ যখন এমবিএ শুরু করলেন নিতান্তই কম চাহিদা জানা সত্ত্বেও এইচআর বেছে নিলেন। তবে সেদিনের সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল তার, আজ তার অবস্থানেই তা প্রমাণ করে। তার চেয়ে বড় বিষয়, নিজের ভালো লাগাটা কাজ করেছিল এই ব্যবস্থাপনার কাজে। তাই পছন্দের এ জগতেরই বাসিন্দা হয়ে গেলেন। ইন্টার্ন করতে এসেই রহিম আফরোজের কাজের পরিবেশ ভালো লেগে যায়, তারপর এখানেই থেকে গেলেন। দেশের শীর্ষ সুপার স্টোর পরিচালনাকারী এই প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদের প্রধান হিসেবেই দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ সায়াদ ইবনে রশীদ। তার বাবা কাজ করতেন খুব বড় একটি সংস্থায়, তা সত্ত্বেও সন্তান আর পরিবারের মানুষকে সময় দিতেন খুব। দুই ছেলেকে নিয়ে ঘুরতেন দেশ-দেশান্তর। তখনই আসলে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষদের কাছে যাওয়ার সুযোগ ঘটে তাদের। জানার কৌতূহল আর শেখার আগ্রহ তার মাঝে সবসময় কাজ করেছে। পারিবারিক ভাবেই দীক্ষিত সায়াদ যখন কর্মজীবনে ঢুকলেন, তখনও চেয়েছেন নিজের সেরাটা সেখানে দেবেন। কাজের তাগিদেই তাকে এখনও নানা কিছু শিখতে হয়, পড়াশোনাটাও ধরে রাখতে হচ্ছে নিত্যনতুন ধ্যানধারণার সাথে নিজেকে এগিয়ে রাখতে যেয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাটা অনেকেই মনে করেন ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অতটা কাজের না। আসলে তা নয়, এই তত্ত্ব আর তথ্যগুলোও বাস্তবতার আলোকে তৈরি, কাজেই নিজের জানার কমতি থাকলে আসলে একটা সময় আটকে যেতে হয় চলার পথে। তাই নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি করে পড়াশোনা করার পরামর্শ দেন তিনি। তবে শেখার পরিধি যেন গ্রন্থে আবদ্ধ না থাকে। তার মতে জানা আর শেখার আগ্রহই প্রমাণ করে কে তার কাজের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল। আর পড়ার পর শিখে সেটা বাস্তবায়ন করতে পারলেই মূল সফলতা পাওয়া যায়। সায়াদ নিজের সব কাজ খুব গুছিয়ে করার চেষ্টা করেন। একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক হতে হলে এই বিষয়টার প্রতি অনেক বেশি সচেতন হতে হবে বলে জানান তিনি। আর এইচআর বিভাগে যেহেতু অনেক মানুষের সাথে কাজ করতে হয়, দলগত কাজটা শেখাও তাই অনেক জরুরি। নিজেকে দলে মানিয়ে নেওয়ার অভিযোজন ক্ষমতা থাকতে হবে সবার মাঝে। প্রকৌশলী বাবা আর শিক্ষিকা মায়ের সন্তান সায়াদের ছেলেবেলা কেটেছে চট্টগ্রাম ও ঢাকায়। রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজেই কেটেছে তার আনন্দময় শৈশব। তার স্ত্রী সাবরিনা জাহান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। দুই সন্তান তৌসিফ আর তাহানীকে নিয়ে এখন তার ভবিষ্যতের পথচলা। সৈয়দ সায়াদ ইবনে রাশেদ ডাক নাম :সায়াদ জন্মতারিখ ও স্থান :৯ অগাস্ট, ঢাকা মায়ের নাম :সাফিনা হোসেন বাবার নাম :সৈয়দ আব্দুর রাশেদ প্রথম স্কুল :ব্রাইট ফোর টিউটরিয়াল প্রিয় পোশাক :শার্ট, প্যান্ট প্রিয় উক্তি :কথায় না, কাজে বড় হও। প্রিয় মানুষ :বাবা-মা আর স্ত্রী অবসর কাটে যেভাবে :পরিবারের সাথে সময় দিয়ে, বই পড়ে। সাফল্যের সংজ্ঞা :সাফল্যের সংজ্ঞা আপেক্ষিক।