[ অ র্থ নী তি ]

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি :চ্যালেঞ্জসমূহ

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৪, ২১:১৬
বাংলাদেশের নব্বই পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সাধারণভাবে লক্ষ্য করা যায় অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহ তার দ্বারা অস্থিতিশীল হয়নি। পাঁচ শতাংশের উপরে ছয় শতাংশের আশেপাশে জিডিপির প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির হার অধিকাংশ সময়েই ডাবল ডিজিটের অংকের নিচে রয়ে গেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দ্রারিদ্র্য নিরসন, মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সহস্রাব্ধ লক্ষ্য পূরণের দিকে যথাযথভাবে এগিয়ে চলেছে। রপ্তানি বৃদ্ধি এবং রেমিটেন্সের প্রবাহ অব্যাহত গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে। বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্থানীয় মুদ্রার শক্তি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যত: যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলেও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটছে না। জিএসপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক যে টানাপড়েন, রানা প্লাজা নিয়ে এবং পোশাক ক্রেতাদের সঙ্গে যে দর-কষাকষি চলছে সেটা সত্ত্বেও রপ্তানি খাতের তেমন কোন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্যদিকে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সব আর্থসামাজিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্তমান সরকারকে মনে হচ্ছে যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়ী। প্রধানমন্ত্রী গত নির্বাচনের আগে যেভাবে বলেছিলেন যে, এই নির্বাচন হচ্ছে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন, পরবর্তীকালে আবার নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এখন তিনি সে কথা বলছেন না। এখন তিনি বলছেন ট্রেন মিস করার কথা। নতুন ট্রেন পাঁচ বছরের আগে যাত্রা শুরু করবে না বলেই মনে হচ্ছে। যদিও একজন ওয়াকেবহাল লোক নির্বাচনের আগে আমাকে বলেছিলেন যে বাংলাদেশে মিশরের মুরসী Variant এর পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে, যদিও সামরিক বাহিনীর আচরণের মধ্যে সেরকম কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কি কোনই অশনি সংকেত নেই? না, সেখানেও কিছু অশনি সংকেত রয়েছে। সেগুলোই হলো সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে কিভাবে মোকাবিলা করবে এটাই এই মুহূর্তে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবার ব্যাপারে সারা দেশে এবং সরকারের ভেতরে তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি দলের মধ্যে কৌশলের নাম করে এদের সংগে নমনীয় আচরণ করা হচ্ছে। এই দ্বন্দ্বের যদি ইতিবাচক মীমাংসা হয় তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হবে এবং যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে। এই পরিস্থিতিতে জামাতের স্ট্র্যাটেজি দু’রকম হতে পারে। তাদের মধ্যে নরমপন্থি ব্যবসায়ী অংশটি যারা কিছুটা আরামপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তারা চাইবেন সরকারের সঙ্গে একটি আপোষ করে নতুন ধর্মীয় লেবাসে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি অব্যাহত রাখতে। আর তাদের উগ্র অংশটি উগ্র জঙ্গিপনার দিকে ঝুঁকবে। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাই উগ্র জঙ্গি অংশটিকে শক্তভাবে মোকাবিলা করা এবং নরম অংশটির অর্থনৈতিক উত্স ও বৈদেশিক সম্পর্কগুলো বন্ধ করে দেয়া। প্রথম কাজটি সহজ হলেও দ্বিতীয় কাজটি সহজ নয় কারণ জামায়াতের বিনিয়োগ জামায়াত বহির্ভূত বহু ধরনের শক্তির সংগে জড়াজড়ি করে রয়েছে। একটিকে আঘাত করলে অপরটিও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, এদের সামাজিক গণভিত্তি যথেষ্ট প্রসারিত হয়েছে। এতকাল বামেরা যে তৃতীয় স্থানটি দখল করেছিল সে স্থানটি এরা দখল করে নিয়েছে। সেজন্য পরবর্তী যে কোন অবাধ জনপ্রিয় ভোটে যদি আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকতে হয় তাহলে তাদেরকে সারা দেশব্যাপী একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবও সম্পন্ন করতে হবে। রাজনৈতিক-ভাবে সকল ধর্ম-ভিত্তিক রাজনৈতিক আদর্শকে পরাজিত করতে হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদি কঠিন একটি কাজ এবং একা আওয়ামী লীগের পক্ষে তা করা সম্ভবও নয়। এজন্য বিস্তৃততর জাতীয় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রয়োজন হবে। এই বহুমুখি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে আগামীতে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু তৈরি হবে না রক্তাক্ত পথে ক্ষমতার পালাবদলও সংঘটিত হতে পারে। সরকারের সামনে অনেকগুলো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনীতিতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের উদ্ভব হয়েছে সরকারি দলের মধ্যেই দুর্নীতিপরায়ণ লুটেরা বুর্জোয়াদের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে। এই শক্তির কিছু কিছু অংশ উত্পাদনশীল কাজে জড়িত থাকলেও তাদের মাইন্ডসেট এখনও বিদেশমুখি অথবা লুণ্ঠন পরায়ণ। এর ফলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি অদ্ভুত বিষয় দেখা যায়। বাংলাদেশের সঞ্চয় হার বিনিয়োগ হারের চেয়ে অধিকাংশ সময়েই বেশি থাকছে! কিন্তু কেন? এর একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনুকূল নয় তাই ধনিক শ্রেণি তাদের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল অলস ফেলে রেখে দিয়েছেন। ধনিক শ্রেণি প্রায়ই বলে থাকেন তাদেরকে সরকার জমির ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন না যেখানে তারা কারখানা তৈরি করতে পারেন। তাছাড়া সরকার তাদেরকে স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে না, সরকার বলছে বিদেশ থেকে ঋণ সংগ্রহ কর। উপযুক্ত অবকাঠামো সমর্থনও অনুপস্থিত। অর্থাত্ রাস্তাঘাট, বিদ্যুত্, গ্যাস, বন্দর, পানি ইত্যাদির সুব্যবস্থা নেই। কাজের চাহিদা আছে কিন্তু ঐ কাজ করতে পারে এই রকম সুশিক্ষিত, দক্ষ লোকও নেই ইত্যাদি। এই কথাগুলো কিছুটা সত্য। কিন্তু একথাও সত্য যে বৃহত্ ধনিকদের একটি বৃহত্ অংশ তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ বাইরে পাচার করে দিচ্ছেন। সম্ভবত এজন্যই সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হিসাবে এই ধরনের ফাঁক নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রাজনীতিতে নানা প্রকার ঘুষ, চাঁদা ও উপঢৌকন প্রদানের মাধ্যমে বৃহত্ ধনী হাউসগুলো আজ দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদ— আমলা—ব্যবসায়ীর একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। এটাকে না ভেঙ্গে অর্থনীতির উত্পাদনশীল সচল অংশগুলোকে বাধাহীনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর এটাকে ভাঙ্গতে পারলে আট শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব ছিল না। এটি অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য একটি যুগপত্ চ্যালেঞ্জ । অর্থনীতির ক্ষেত্রে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকৃত ইতিবাচক শক্তিগুলোকে চিহ্নিত করা। একাজ ইতিমধ্যেই আমাদের অর্থনীতিবিদরা করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ি এরা হচ্ছেন, বাংলাদেশের পরিশ্রমী কৃষক সমাজ। বাংলাদেশে শ্রমঘন রপ্তানি শিল্পে কর্মরত শ্রমিক সমাজ। যাদের অধিকাংশ হচ্ছেন নারী। তৃতীয় শক্তিটি হচ্ছে বাইরে কর্মরত বাংলাদেশের নাগরিকবৃন্দ, যারা খেয়ে না খেয়ে রেমিটেন্স দেশে পাঠাচ্ছেন। চতুর্থ শক্তিটি হচ্ছে এসএমই অর্থাত্ Small and medium enterprises-এর উদ্যোক্তাগণ। স্বল্প ও মাঝারি পুঁজির মালিকরা তাদের বহুমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি এই সমস্ত উদ্যোগে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাদের উদ্যোগগুলোর জন্যই বহু উপজেলা সদরে একধরনের ”Growth Center” গড়ে উঠেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে চীনের ”টাউনশিপ বা রুরাল ইন্ডাস্ট্রিগুলো” বিশ্ব বাজারে যেভাবে দাম, পরিমাণ ও গুণের দিক থেকে বিপুল আধিপত্য সৃষ্টি করেছে আমাদের দেশেও সেই অভিজ্ঞতার “Experiment” সম্ভব বলে আমি মনে করি। কিন্তু সেজন্য চীন সরকারের মতো ক্ষমতাসীন সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এদেরকে সন্তানের মত যত্ন করে বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়ার জন্য। কিন্তু তার আগে তাদেরকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় গুণগত মান এবং উত্পাদনের পরিমাণগত মাত্রা অর্জনের সক্ষমতা তৈরি করে দিতে হবে। সে জন্য ঋণ পদ্ধতির সংস্কার এবং সেখানে লীকেজ (বড় ঋণখেলাপীদের কাছে আটকে থাকা অর্থই হচ্ছে ব্যাংকগুলোর জন্য একধরনের লীকেজ বা হেমারেজ বা রক্তক্ষরণ) বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামে ও শহরে সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুতের সরবরাহ করতে হবে এবং সেজন্য বিদ্যুত্ সরবরাহ বৃদ্ধি ও উত্পাদন খরচও কমিয়ে আনতে হবে। অজস্র কর্মমুখি কারিগরি শিক্ষালয় সৃষ্টি করে দক্ষ শ্রমশক্তির সরবরাহ বৃদ্ধি করতে হবে। তখন এদের চাকরি এসব এসএমইতে কিছুটা হবে এবং বাকিরা বাইরে প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে চলে যাবেন ও উচ্চহারে রেমিটেন্স পাঠাবেন। বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের যে আতংকজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এই পলিসি প্যাকেজসহ SME-ই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর সুযোগ। তবে সবকিছুর মূলে রয়েছে কৃষি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, কৃষির বহুমুখিকরণ ও খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সরকারের ঘোষিত ইস্তেহার, বক্তব্য ও নীতিমালায় এসব স্ট্র্যাটেজির উল্লেখ লক্ষ্য করা যায় কিন্তু সরকারি দলের একটি শক্তিশালী অংশের শ্রেণি চরিত্র এখনও পর্যন্ত এসব নীতিমালার বিরোধী। আন্তর্জাতিক নিওলিবারালরাও সরকারকে এপথে এগোতে দিতে চায় না। অর্থনীতিতে যে কোন বর্ধিত সরকারি হস্তক্ষেপের তারা তীব্র বিরোধী। কিন্তু সুনীতি এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক সুনীতিগুলির কঠোর নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবায়ন ছাড়া এই পথে এগোনো সম্ভব নয়। তাই পরিস্থিতিকে বদলে দিয়ে দলকে বদলানোর একটি চ্যালেঞ্জ আওয়ামী লীগের সামনে উপস্থিত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে না পারলে ভবিষ্যতে হয়তো তৃতীয় কোন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় ফিরে আসবেন। সেটা পশ্চাদমুখিও হতে পারে আবার প্রগতিশীলও হতে পারে। আবার মিশ্রও হতে পারে। লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়