বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত শিশু সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দেশের শিশুরা বেড়ে উঠবে। শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা জঙ্গি, সন্ত্রাস ও মাদককে বর্জন করে লেখাপড়া, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের মত মানুষ হয়ে দেশের সেবা করবে। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুর নিরাপদ ও উন্নত জীবনের লক্ষ্যেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। কারণ এগুলো মানুষকে ধ্বংস করে দেয়।
গতকাল সোমবার দুপুরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ওই শিশু সমাবেশের আয়োজন করে। শিশু লুবাইনা রুবাব সাফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিশু ও মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, শিশু শাহরিয়ার আলম মাহিন প্রমুখ। এর আগে সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়ায় এসে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা শিশুদের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে সমাবেশে বলেন, আর কোন শিশুই রাসেলের মতো নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে না। কোন শিশুরই না খেয়ে দিন-রাত কাটবে না। তারা নিরক্ষর থাকবে না। শিশুরা নিরাপদ ও সুন্দর জীবন পাবে। অভিভাবকদের প্রতি তিনি বলেন, শিশুদের আদর স্নেহ দিয়ে বড় করুন। বড় হয়ে যেন তারা সত্যিকার দেশ প্রেমিক ও সুনাগরিক হয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে ১৯৭৪ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করেন। আমরা ২০১১ সালে শিশুনীতি প্রণয়ন করেছি। শিশুর শারীরিক, মানসিক নির্যাতন ও বৈষম্য বন্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি। প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণীতে উন্নিত করে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করেছি। শতভাগ শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি।
শেখ হাসিনা বলেন, পড়াশুনার পাশাপাশি আমরা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার ব্যবস্থা করেছি। শিশুদের জন্য জাতির পিতার জীবন-কর্ম ভিত্তিক ২৫টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছি। শিশুদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে পাঠ্য পুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া পথ শিশু, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু ও ঝরেপড়া শিশুদের কল্যাণে আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কারাগারে আটক শিশুদের সংশোধন ও পুনর্বাসন করার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি ২০২১ ও ২০৪১ রূপকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী প্রজম্মের জন্য একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে বলেন, আসুন, আমাদের বর্তমানকে শিশুদের জন্য উত্সর্গ করি। মেধা-মননে সেরা একটি ভবিষ্যত্ প্রজম্ম গড়ে তুলি।
আলোচনা সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর জম্মদিন উপলক্ষে জেলা শিশু একাডেমী আয়োজিত সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রাংকন ও সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার ও সনদপত্র বিতরণ করেন। এরপর গোপালগঞ্জ শিশু একাডেমীর শিশু শিল্পীরা ‘চির ভাস্মর বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক কাব্য নৃত্য গীতি আলেখ্য পরিবেশন করে। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ কমপ্লে¬েক্স জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র আয়োজিত দিনব্যাপী গ্রন্থ মেলার উদ্বোধন করেন।
বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা:সকালে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ গোটা জাতির পক্ষ থেকে স্বাধীনতার রূপকার বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদেন করেন। এরপর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। পরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পবিত্র ফাতেহা পাঠ করেন। দোয়া ও মোনাজাত করা হয় বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায়। পরে দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ সমাধি সৌধে রক্ষিত পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
এ সময় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহম্মেদ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশারফ হোসেন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান ,আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক লে. কর্নেল ( অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. খায়রুল আলম খানসহ মন্ত্রীপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, তিনবাহিনী প্রধানগণ, ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাষ্ট্রপতি বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে টুঙ্গিপাড়া থেকে বঙ্গভবনে ফিরে যান। এরপর জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক, শ্রমজীবী ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বিকেল ৩টায় ১৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশ্যে টুঙ্গিপাড়া ত্যাগ করেন।
সমাধিতে মানুষের ঢল:প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বঙ্গবন্ধুর সমাধি অবমুক্ত করে দেয়া হয়। তখন সেখানে মানুষের ঢল নামে। উত্সবমুখর পরিবেশে হাজার হাজার মানুষ ফুল দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি জম্মদিনের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাঙালির ফুল ও ভালবাসায় হাজার বছরে শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু সিক্ত হন।
