বৃহত্তর সিলেটের নদ-নদীর উত্স্যমুখসহ বিভিন্ন স্থানে নদ-নদী ভরাট হয়ে গেছে। এতে ভাটির জনপদে নৌপথ বন্ধ, চাষবাসে সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এছাড়াও সিলেটে বিকাশমান পর্যটন শিল্পেও মুখ থুবড়ে পড়ার নতুন আশংকা দেখা দিয়েছে। একদিকে নদী হারাচ্ছে তার বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে দূষণের মাত্রাও বাড়ছে। বিশেষ করে পানিতে বর্জ্য মিশ্রণের ফলে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ভাটির জনপদের নদীগুলো। তীরবর্তী জনপদের জীবন-জীবিকা বদলে যাচ্ছে। বিলীন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। কমছে মাছের উত্পাদন। গতিপথ পরিবর্তন, নাব্যতা হ্রাসে নদী ভাঙ্গন ব্যাপক হচ্ছে।
দেরিতে হলেও সিলেটের বাসিয়া নদী পুন:খননের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। বেশ ক’বছর থেকে নদীটি খনন করার কথা শুনা যায়। অবশেষে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী গত ১৪ মার্চ নদী খনন কাজের উদ্বোধন করেন। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের তহবিলের ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাসিয়া নদীর খননকাজ করা হবে।
সিলেটের প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, মনু, ধলাই, পিয়াইন, সারি, সুতাং, রত্না, সোনাই, করাঙ্গী, ঝিংড়ি, ভেড়ামোহনা, রক্তি, কালনী, বৌলাইসহ অসংখ্য নদীর নাব্যতা হারিয়ে গেছে। নদী ভরাটের কারণে বোরোচাষীরা হাহাকার করেন এই মৌসুমে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য সুরমা ও কুশিয়ারা এখন যৌবনহারা। ভাঙ্গনে জকিগঞ্জের বহু এলাকা মানচিত্র থেকে ‘হারিয়ে’ পার্শ্ববর্তী ভারতের দখলে চলে গেছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের সুরমা ও কুশিয়ারাসহ ৩০ টি নদী এবং মৌলভীবাজারের মনু, ধলাই এবং হবিগঞ্জের খোয়াইসহ ২৩টি নদীই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
আগের দিনে পাহাড়ে বৃষ্টির হলে ঘন বৃক্ষ-লতা-গুল্মে পানি আটকে থাকতো এবং সময় নিয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতো পানি। এতে মাটির ক্ষয় হতো না। এখন বৃষ্টির পানির সাথে উদাম কিংবা ন্যাড়া পাহাড় ধুয়ে লাখ লাখ টন বালি এসে ভাটিতে নদীর তলদেশে ভরাট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে পরিবেশ বিপর্যয়ে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় ৪০ লক্ষাধিক মানুষ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। নতুন সংকট সৃষ্টি হবে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
সিলেটের পর্যটন অঞ্চল কোমপানীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২৯৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দারা একমাত্র ধলাই ও পিয়াইন নদীর উপর নির্ভরশীল। খরস্রোতা ধলাই নদী অস্তিত্বহীন। পাহাড়, নদী-ছড়া-ঝর্ণা আর সবুজে ভরা পর্যটন এলাকা জৈন্তাও তার রূপ হারাচ্ছে সারি নদী শুকিয়ে যাচ্ছে বলে।
কদিন আগে পিয়াইন, ধলাই, সারি নদী দেখতে গেলে নদীর করুন চিত্র চোখে পড়ে। সারি নদীর উপর অনেকটাই নির্ভর করছে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠা বিশাল নাজিমগড় রিসোর্ট। অপরিকল্পিতভাবে বালি-পাথর উত্তোলনে ক্ষত-বিক্ষত নদীর সেকি চেহারা! বার বার নৌকা আটকে যায় বালির চরে। এসব পাহাড়ি নদীকে কেন্দ্র করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জাফলং, লালাখালসহ বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দশকে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প। এই পরিস্থিতিতে শিল্পটি অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে।
সিলেটে পানির বড় উত্স সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। এই দুই নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে বলে অন্যান্য নদী ও খালের মাছ ও জলজ উদ্ভিদও মরে যাচ্ছে। ২১৭ মাইল দীর্ঘ সুরমা নদী বিভিন্নস্থানে ভরাট। অন্যদিকে নদী দূষণও অব্যাহত রয়েছে। নদীর আশপাশ এলাকা থেকে নিঃসৃত হচ্ছে বর্জ্য। নগরীর নদীতীরবর্তী অন্ততঃ ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অসংখ্য ড্রেন দিয়ে পুঁতিগন্ধময় বিষাক্ত কালো পানি সুরমা নদীতে মিশ্রিত হচ্ছে। এতেই গোসল ও গৃহস্থলি কাজ চলছে। মত্স্য আড়ত্ কাজীর বাজারে মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেখানে প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকার প্রয়োজন ৫ মিলিগ্রাম সেখানে সুরমা নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন রয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। এছাড়া আয়রন, কয়লা ও বালুকণা মাত্রাতিরিক্ত রয়েছে।
ভারতের আসামের বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জ অমলসিদ নামক স্থানে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বরাক অমলসিদের নিকট এসে ‘ইউ টার্ন’ নিয়ে সুরমা নাম ধারণ করেছে। আর সোজা নেমে যাওয়া নদীটির নাম কুশিয়ারা। কর্মকর্তারা জানান, বরাকের শতকরা ৭০ ভাগ পানি কুশিয়ারা নদী দিয়ে, অবশিষ্ট ৩০ ভাগ পানি প্রবাহিত হয় সুরমায়। সুরমা বরাক নদীর সঙ্গে আড়াআড়িভাবে থাকার ফলে সুরমার উত্সমুখে পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে বিশাল চর পড়ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা নদীর প্রবাহ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
কর্মকর্তারা জানান, সুনামগঞ্জ থেকে ৩৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের ‘বাউলা’ নদীর কারণে সুরমা কোনমতে বেঁচে আছে। আগস্ট মাসে সুরমা নদীতে প্রবাহ থাকলেও, নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুরমার পানি প্রবাহ শূন্যের কোঠায় পৌঁছে। তখন খাবার পানিরও সংকট হয় চরম। শাবি’র সিভিল এন্ড এনভারনমেন্টাল বিভাগের প্রফেসর ড. জহির বিন আলম সুরমা নদীর উপর গবেষণা রিপোর্টে বলেছেন, সুরমা ভরাট হয়ে গভীরতা হ্রাস পেয়েছে। সুরমাকে বাঁচাতে হলে বর্জ্য শোধনাগার তৈরি করতে হবে। নদীর দু’পাশের ব্যাপক বৃক্ষায়ণ ও নদী ড্রেজিং জরুরী।
